তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে আসিফ নজরুলের স্মৃতিচারণ, নানা বিতর্কের অবসান

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৪ মে ২০২৬ ০৩:৪৮ অপরাহ্ণ   |   ৪৫ বার পঠিত
তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে আসিফ নজরুলের স্মৃতিচারণ, নানা বিতর্কের অবসান

বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক ডালপালা মেলেছে।

 

বিশেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হতে দেখা যায়। এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে এবার অত্যন্ত স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তারেক রহমানের ছাত্রত্ব ও তৎকালীন ক্যাম্পাস জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরেছেন। আসিফ নজরুলের এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও সুধী মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

আইন বিভাগের সেই দিনগুলো

ড. আসিফ নজরুল তার পোস্টে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত করেছেন যে, তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি জানান, তারেক রহমান ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। আসিফ নজরুল নিজে ওই সময় আইন বিভাগের উপরের ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। সিনিয়র হিসেবে তিনি বিষয়টি তখনকার সময় থেকেই জানতেন।

 

তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান শুধুমাত্র ভর্তিই হননি, বরং নিয়মিতভাবে ক্লাসেও অংশ নিয়েছেন। আসিফ নজরুল উল্লেখ করেন, ভর্তি হওয়ার পর প্রায় মাস দুয়েক তিনি নিয়মিত ক্লাস করেছিলেন। সে সময় বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের জানাশোনা ছিল।

 

সহপাঠীদের তালিকায় বিশিষ্টজনরা

তারেক রহমানের ছাত্রত্বের বিষয়টি আরও জোরালো হয় তার সহপাঠীদের নামের তালিকা থেকে। আসিফ নজরুল তার লেখনীতে কয়েকজন অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন, যারা ওই একই সময়ে তারেক রহমানের সাথে একই বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন।

 

এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বর্তমান বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। সমসাময়িক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, আইনসভা এবং নির্বাহী বিভাগের উচ্চপর্যায়ে আসীন হওয়া এই ব্যক্তিবর্গ একসময় তারেক রহমানের সহপাঠী ছিলেন। তাদের এই পরিচয় তারেক রহমানের প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতির এক অনস্বীকার্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে।

 

পড়াশোনা বন্ধের নেপথ্য কারণ

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি বা স্নাতক সম্পন্ন করতে পারেননি। ড. আসিফ নজরুল এই বিষয়টির উপরও আলোকপাত করেছেন। তিনি তার পর্যবেক্ষণে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।

 

আশি’র দশকের সেই সময়টিতে দেশে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন চলছিল। রাজনৈতিকভাবে সেটি ছিল এক চরম অস্থির সময়। আসিফ নজরুল তার পোস্টে উল্লেখ করেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে এরশাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তখন বেশ জোরালো ছিল। এমতাবস্থায়, শহীদ রাষ্ট্রপতির পুত্র হিসেবে তারেক রহমানের জন্য ক্যাম্পাসে অবস্থান করাটা নিরাপত্তার দিক থেকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

 

সম্ভবত এই প্রবল নিরাপত্তাহীনতার কারণেই তারেক রহমানকে তার প্রিয় বিদ্যাপীঠ এবং আইন বিভাগের পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈরিতা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়ে একজন মেধাবী ছাত্রের উচ্চশিক্ষা ব্যাহত হওয়ার এটি একটি করুণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বিতর্ক বনাম বাস্তবতা

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সমালোচকরা প্রায়ই তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং ওই সময়ের সিনিয়র শিক্ষার্থী হিসেবে আসিফ নজরুলের এই সাক্ষ্য সেই সব অপপ্রচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শিক্ষা জীবনে কোনো প্রতিবন্ধকতা আসার অর্থ এই নয় যে, ওই প্রতিষ্ঠানে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ড. নজরুলের এই তথ্যবহুল বর্ণনা প্রমাণ করে যে, তারেক রহমান যোগ্যতার ভিত্তিতেই দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন।

 

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া

আসিফ নজরুলের এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিএনপির সমর্থকদের মতে, এটি সত্যের জয় এবং যারা দীর্ঘকাল ধরে অপপ্রচার চালিয়ে আসছে তাদের জন্য একটি জবাব। অন্যদিকে, নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসিফ নজরুলের মতো একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এই জবানবন্দি ইতিহাসের সত্য উদঘাটনে সহায়ক হবে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর থেকে রাজনীতির রাজপথ- তারেক রহমানের যাত্রাপথ কখনোই মসৃণ ছিল না। আসিফ নজরুলের স্মৃতিচারণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তৎকালীন স্বৈরশাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অনেক সম্ভাবনাকেই অঙ্কুরে বিনষ্ট হতে হয়েছিল। তবে কয়েক দশক পর হলেও সত্য যখন প্রকাশিত হয়, তখন তা ইতিহাসের ধুলোবালি সরিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তারেক রহমানের ছাত্রত্ব নিয়ে তোলা প্রশ্নগুলো এখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ এর পেছনে রয়েছে স্বয়ং একজন অধ্যাপকের চাক্ষুষ প্রমাণ ও সমসাময়িক বিশিষ্টজনদের নাম।

 

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির উত্তাল দিনগুলোতে একজন ছাত্রের শিক্ষাজীবন কীভাবে বৃহত্তর রাজনীতির শিকার হয়, তারেক রহমানের এই ঘটনাটি তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ। আসিফ নজরুলের এই স্বীকারোক্তি কেবল একটি ফেসবুক পোস্ট নয়, বরং এটি একটি সময়ের দলিল যা আগামী দিনে গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য তথ্যের আধার হিসেবে কাজ করবে।