দীপু মনিসহ তিনজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৭ মে ২০২৬ ০৪:৫৮ অপরাহ্ণ   |   ৪৩ বার পঠিত
দীপু মনিসহ তিনজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের ঘটনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন মোড় নিয়েছে। 

 

এই মামলায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আগামী ১৪ মে আসামিদের ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আবেদন করা হয় যে, শাপলা চত্বরের ওই বর্বরোচিত ঘটনায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকা ডা. দীপু মনি, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

 

রাষ্ট্রপক্ষ তাদের আবেদনে উল্লেখ করে, ২০১৩ সালের সেই ঘটনার পেছনে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে উস্কানিদাতাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যেহেতু এই তিন ব্যক্তি অন্য মামলায় কারাগারে আছেন, তাই তাদের আইনগত প্রক্রিয়ায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা আবশ্যক। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আগামী ১৪ মে শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

 

আদালত পরবর্তী কার্যক্রম শেষে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, শাপলা চত্বরের অভিযানে যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছিল, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ তদন্ত সংস্থার হাতে আসছে।

 

তিনি বলেন, ‘আমরা আসামিদের প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চেয়েছিলাম। আগামী ১৪ মে তাঁদের হাজির করা হলে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। এরপর তদন্তের স্বার্থে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য তাঁদের ‘সেফ হোম’-এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

 

চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে সরেজমিনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, যারা ওই অভিযানে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে নাস্তিকবিরোধী ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনরত হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর গভীর রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে কতজন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়তে থাকে।

 

এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, হাসান মাহমুদ খন্দকার ও বেনজীর আহমেদের নামও আসামির তালিকায় রয়েছে। শুধু প্রশাসন বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, তৎকালীন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এবং পুলিশের বিতর্কিত কর্মকর্তা মোল্যা নজরুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তিকে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী বা সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডা. দীপু মনি তৎকালীন সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতা হিসেবে এই অভিযানের রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, মোজাম্মেল হক বাবু এবং ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ব্যবহার করে ওই রাতে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা গোপন রাখা এবং আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে উস্কানিমূলক ও মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে গণহত্যামূলক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিলেন। ট্রাইব্যুনাল খতিয়ে দেখছে, পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তারা কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী হয়েছিলেন কি না।

 

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর শাপলা চত্বরের ঘটনায় নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যুর নিশ্চিত প্রমাণ ও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে মাদ্রাসা ছাত্র, সাধারণ পথচারী ও নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করছে, সেদিনের অভিযানে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল, যা কোনোভাবেই আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে পদ্ধতিগত অপরাধ বা 'সিস্টেমেটিক ক্রাইম' হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরা।

 

আগামী ৭ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ওপর নির্ভর করছে এই বিচার প্রক্রিয়ার গতিপ্রকৃতি। যদি ওই সময়ের অভিযানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরাসরি ‘অর্ডার টু শুট’ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিচারিক ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলো আশা করছেন, গত সরকারের আমলে যে ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল, ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তার সঠিক বিচার হবে।

 

ট্রাইব্যুনালের আজকের এই আদেশটি রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমকর্মীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাজির করার নির্দেশ এই প্রথম বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। আইনজ্ঞদের মতে, অপরাধে প্ররোচনা বা উস্কানি দেওয়াও রোম স্ট্যাটিউট অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় আসতে পারে।

 

আগামী ১৪ মে ডা. দীপু মনিসহ তিনজনের হাজিরা এবং ৭ জুনের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের দিকেই এখন দেশবাসীর নজর। শাপলা চত্বরের সেই রক্তাক্ত রাতের বিচার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আলোর মুখ দেখবে কিনা, তা সময়ের পরিক্রমায় স্পষ্ট হবে।