অনলাইন ডেস্ক:
বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৬ সাল গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে দেখা দিচ্ছে। চলতি বছরে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও কানাডার কুইবেক প্রদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনগুলোকে ঘিরে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থার বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে গত দেড় দশকের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই নির্বাচন নাগরিকদের—বিশেষ করে তরুণদের—মুক্ত, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ এনে দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। একদলীয় শাসনের সময় দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনই ছিল এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ ১৮ বছরের নিচে। এই বাস্তবতায় তরুণ নেতৃত্বের উত্থান ও নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশকে তৃণমূলভিত্তিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। নির্বাচনটি বিশ্বাসযোগ্য হলে দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক মানদণ্ড ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার হতে পারে। তবে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোটগ্রহণ হবে।
মার্কিন ইতিহাস অনুযায়ী মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন দল ক্ষতির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক জরিপে ইঙ্গিত মিলছে, রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে এবং সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সীমিত হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার ভারসাম্যই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার বিষয়েও বড় পরীক্ষা নেবে। কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক পার্টির অবস্থান শক্ত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের জবাবদিহি আরও জোরদার হতে পারে।
ব্রাজিলে আগামী ৪ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৭৯ বছর বয়সী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্নীতি মামলায় সাজা, কারাবাস, মুক্তি এবং পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা—লুলার রাজনৈতিক জীবন নানা নাটকীয়তায় ভরা। ২০২২ সালে তিনি জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অল্প ব্যবধানে জয়ী হন। বর্তমানে জনমত জরিপে দেশ পরিচালনা নিয়ে জনগণের মতামত বিভক্ত।
আসন্ন নির্বাচনে বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। এই নির্বাচন ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে ফেরার সুযোগ তৈরি করবে, নাকি নতুন অনিশ্চয়তা ডেকে আনবে—তা নির্ধারণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কানাডার কুইবেক প্রদেশে ৫ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফরাসি ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশেষ আইনি ব্যবস্থার কারণে কুইবেক দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা পরিচয় বহন করে আসছে। একই সঙ্গে প্রদেশটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে আন্দোলনও পুরোনো।
বর্তমান সরকার ফরাসি ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা ও ধর্মনিরপেক্ষতা জোরদারের যে আইন করেছে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। নির্বাচনী প্রচারে এসব ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ‘আভেনির কুইবেক’, লিবারেল পার্টি অব কুইবেক ও পার্টি কুইবেকোয়া (পিকিউ) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা পিকিউ কুইবেকের স্বাধীনতা নিয়ে তৃতীয় দফা গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কানাডার সাংবিধানিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চারটি নির্বাচন শুধু সংশ্লিষ্ট দেশ ও অঞ্চলের ভবিষ্যৎই নয়, বৈশ্বিক গণতন্ত্রের গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।