চীনকে বাংলাদেশের মাটিতে কারখানা স্থাপন ও বিনিয়োগের আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৪ মে ২০২৬ ০৩:৪৪ অপরাহ্ণ   |   ৪৭ বার পঠিত
চীনকে বাংলাদেশের মাটিতে কারখানা স্থাপন ও বিনিয়োগের আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক কেবল পন্য আদান-প্রদান নয়, বরং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের এক অনন্য পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। 

 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর এক অভিজাত কেন্দ্রে আয়োজিত 'দ্বিতীয় বাংলাদেশ-চীন গ্রিন টেক্সটাইল এক্সপো'র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেই বন্ধুত্বের প্রতিফলন আরও একবার স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চীনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে দেশটিতে বিনিয়োগের পরিধি আরও বিস্তৃত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

 

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশ এখন আর কেবল সস্তা শ্রমের দেশ নয়, বরং এটি এখন উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায়।

 

তিনি বলেন, চীন আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। আমাদের শিল্প খাতের বিকাশে চীনের অবদান অনস্বীকার্য। তবে আমরা চাই চীন কেবল পণ্য রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের মাটিতে কারখানা স্থাপন ও সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) আরও বাড়াক।

 

বিশেষ করে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী 'পাট শিল্পকে' পুনরুজ্জীবিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি চীনের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাটজাত পণ্যকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য বেইজিংয়ের কারিগরি সহায়তা চান। মন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে বিশেষজ্ঞরা ‘স্মার্ট ডিপ্লোমাসি’ হিসেবে দেখছেন, কারণ সোনালী আঁশের এই হারানো গৌরব ফিরে পেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত 'ইয়াও ওয়েন'বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এক ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে চীন তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উল্লেখ করেন যে, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘকাল পাশে ছিল, তবে এখন থেকে গুরুত্ব দেওয়া হবে ‘গ্রিন টেকনোলজি’ বা সবুজ প্রযুক্তিতে।

 

তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতের আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব কারখানায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, চীন এখন বাংলাদেশের কেবল আমদানিকারক দেশ নয়, বরং শিল্প উন্নয়নের এক শক্তিশালী কারিগরি অংশীদার হতে আগ্রহী।

 

রাজধানীতে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এই তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীটি সাজানো হয়েছে আধুনিক সব প্রযুক্তির পসরা নিয়ে। বাংলাদেশ ও চীনের খ্যাতনামা কয়েকশ কোম্পানি এই এক্সপোতে অংশ নিচ্ছে। প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:

 

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি: কম পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ওয়াশিং মেশিন, ডাইং মেশিন এবং সোলার চালিত টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির সরাসরি প্রদর্শনী।

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি: টেক্সটাইল কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (ZLD) প্রযুক্তির ব্যবহার।

 

স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে গার্মেন্টস উৎপাদনে ত্রুটি কমানোর আধুনিক পদ্ধতি।

 

প্রদর্শনী কেবল পণ্য বিক্রির জায়গা নয়, বরং এটি প্রযুক্তিবিদ, বিনিয়োগকারী এবং শীর্ষ উদ্যোক্তাদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সেমিনার ও প্যানেল আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরছেন কীভাবে 'মেড ইন বাংলাদেশ' ট্যাগটি বিশ্বের দরবারে আরও টেকসই ও ব্র্যান্ডেড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।

 

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন কেবল পরিবেশবান্ধব কারখানা থেকেই পণ্য কিনছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব বা 'লিড' (LEED) সার্টিফাইড কারখানার দেশ। তবে এই অর্জনকে ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে চীনের সস্তা অথচ উন্নত গ্রিন টেকনোলজির কোনো বিকল্প নেই।

 

চীনে উৎপাদিত উন্নত মেশিনারি এখন ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। ফলে বাংলাদেশের মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও যেন সবুজ বিপ্লবে অংশ নিতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, চীন যদি এই প্রযুক্তিতে বাংলাদেশে জয়েন্ট ভেঞ্চার (Joint Venture) বিনিয়োগ করে, তবে এটি দুই দেশের জন্যই একটি 'উইন-উইন' পরিস্থিতি তৈরি করবে।

 

বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পাটের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাট পচানো থেকে শুরু করে পাটের সূক্ষ্ম সুতা তৈরি এবং বহুমুখী পাটজাত পণ্য (যেমন—ব্যাগ, কাপড়, কার্পেট) তৈরিতে চীন বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তির অধিকারী। বাংলাদেশের কাঁচামাল আর চীনের প্রযুক্তি মিলে গেলে বিশ্ববাজারে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের জয়জয়কার পুনরায় শুরু হতে পারে। এটি কেবল অর্থনৈতিক আয় বাড়াবে না, বরং পরিবেশ রক্ষায়ও অনন্য ভূমিকা রাখবে।

 

চীন-বাংলাদেশের বাণিজ্যে বর্তমানে একটি বড় ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ চীন থেকে প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করলেও রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলক কম। এই ঘাটতি কমানোর একমাত্র উপায় হলো চীনের বিনিয়োগকে বাংলাদেশের স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলোতে (SEZ) আকর্ষণ করা। আজকের এই প্রদর্শনী সেই লক্ষ্যেই একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ।

 

চায়না-বাংলাদেশ গ্রিন টেক্সটাইল এক্সপো ১৬ মে পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকছে। এই তিন দিনের আলোচনা এবং ব্যবসায়িক চুক্তিগুলো আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে বিলিয়ন ডলারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও চীন এখন আর কেবল ক্রেতা-বিক্রেতা নয়, বরং এক নতুন টেকসই শিল্প বিপ্লবের সহযাত্রী। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বিনিয়োগের আহ্বান এবং চীনের রাষ্ট্রদূতের ইতিবাচক সাড়া—এই দুইয়ে মিলে বাংলাদেশের পোশাক ও শিল্প খাত এক নতুন সোনালী ভোরের প্রত্যাশা করছে। সবুজ প্রযুক্তির এই হাতবদল কেবল কারখানার চাকা ঘোরাবে না, বরং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের অর্থনীতিকে দেবে এক সুদৃঢ় ভিত্তি।