প্রতি বছরের জানুয়ারিতে মানুষ নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে দারুণ উৎসাহে ভরে ওঠে। মনে হয়, এ বছরেই জীবনের সবকিছু পাল্টে ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রীষ্ম আসার আগেই অধিকাংশ মানুষ আবার আগের অভ্যাসে ফিরে যায়।
এটা সাধারণত শৃঙ্খলার ঘাটতির কারণে হয় না। আসল সমস্যা হলো-আমরা রেজোলিউশন বানাই ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে। আমরা বড় পরিবর্তনের জন্য নিজেদের ওপর চাপ সৃষ্টি করি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের সেই ছোট আচরণগুলো বদলাই না, যেগুলো নতুন অভ্যাস টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ইচ্ছাশক্তি সাময়িকভাবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কার্যকর নয়। বিপরীতে, একবার কোনো কাজ অভ্যাসে পরিণত হলে সেটি প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে।
এখানেই মূল অভ্যাস (Keystone Habits)–এর গুরুত্ব।
মূল অভ্যাস এমন এক ধরনের আচরণ, যা শুধু নিজেই উপকারী নয়, বরং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করে। চার্লস ডুহিগ তার The Power of Habit বইয়ে এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন। একটি মূল অভ্যাস গড়ে উঠলে তা এক ধরনের ইতিবাচক চেইন তৈরি করে, যার ফলে অন্যান্য ভালো অভ্যাসও সহজে যুক্ত হতে শুরু করে।
ধরা যাক, প্রতিদিন সকালে কয়েক মিনিট গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস। এটি শুধু মানসিক চাপ কমায় না, বরং সচেতনতা বাড়ায়, ঘুমের মান উন্নত করে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের দিকে ধাবিত করে। অর্থাৎ, একটি ছোট অভ্যাস জীবনের নানা দিককে প্রভাবিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পুরো জীবন এক বছরে বদলানোর দরকার নেই। বরং সঠিক জায়গায় মনোযোগ দিয়ে ছোট কিন্তু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তুললেই বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
কেন মূল অভ্যাস রেজোলিউশনের চেয়ে বেশি কার্যকর
মূল অভ্যাস কেবল দৈনন্দিন করণীয় তালিকার আরেকটি কাজ নয়। এটি এমন আচরণ, যা সারাদিন শরীর ও মস্তিষ্ককে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। এই অভ্যাসগুলো আত্মনিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং ধারাবাহিকতা বাড়ায়, ফলে অন্য ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নিয়মিত ব্যায়াম শুধু শক্তি বাড়ায় না; এটি ব্যথা কমায়, মন ভালো রাখে এবং ঘুমের মান উন্নত করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো বোধ করলে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলোও স্বাভাবিকভাবে সহজ হয়ে যায়।
আচরণগত বিজ্ঞানের ভাষায়, অভ্যাস মস্তিষ্কের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ কমায়। একবার কোনো আচরণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে, সেটির জন্য আর অতিরিক্ত ইচ্ছাশক্তির দরকার হয় না। ফলে মানসিক শক্তি অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা যায়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে এমন ৩ মূল অভ্যাস
কোচ ডানা সান্তাস দীর্ঘদিন ধরে নিজের জীবন ও পেশাগত অভিজ্ঞতায় মূল অভ্যাসের শক্তি ব্যবহার করে আসছেন। তার মতে, এই অভ্যাসগুলোর প্রভাব গভীর ও স্থায়ী।
তিনি সুস্থতার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের কথা বলেন, যেখানে একটি করে মূল অভ্যাস গড়ে তোলা সবচেয়ে কার্যকর।
দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস
প্রতিদিন কয়েক মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করলে মানসিক চাপ সামাল দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে এবং মন শান্ত থাকে। ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে শ্বাস নেওয়া, বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে নিঃশ্বাস ছাড়া, প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে। এর ফলে শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া হ্রাস পায়।
নিয়মিত এই অনুশীলন মানসিক নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে উন্নত করে, পেশির টান কমায় এবং বিশ্রাম ও শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। পাশাপাশি, সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাস ভঙ্গি ও চলাফেরার মান উন্নত করে, কারণ সঠিক শ্বাস নেওয়ার কৌশল মেরুদণ্ডের স্থায়িত্ব, পাঁজরের অবস্থান এবং কাঁধের কার্যকারিতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
চেষ্টা করার জন্য কয়েকটি উপায়-
প্রতিদিন সকালে বিছানা থেকে ওঠার আগে ছয়বার ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নিন।
কফি বা চা পান করার সময় কয়েক মিনিট নিন এবং মনোযোগসহকারে ধীরে শ্বাস নিন।
দিনে তিনবার ফোনে রিমাইন্ডার সেট করে ৯০ সেকেন্ড ধরে গভীর শ্বাসের অনুশীলন করুন।
শরীর-মন সংযোগে ব্যায়াম
মাইন্ডফুল মুভমেন্ট কেবল ব্যায়াম নয়। এটি এমন এক ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শরীরের সচেতনতা বাড়াতে এবং চলাফেরার গুণমান উন্নত করতে সাহায্য করে। এই অভ্যাসগুলো ব্যথা কমায়, ভঙ্গি ঠিক রাখতে সহায়তা করে এবং শক্তি ও গতিশীলতার প্রশিক্ষণকে আরও কার্যকর করে তোলে। নিয়মিত ও মনোযোগসহকারে ব্যায়াম করলে শরীর দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
চেষ্টা করার জন্য কিছু উপায়-
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পাঁচ মিনিটের একটি যোগব্যায়াম রুটিন অনুসরণ করুন।
দুপুরে ছোট একটি মুভমেন্ট ব্রেক নিন-চারপাশে একটু হাঁটুন, প্রিয় গানের সঙ্গে নাচুন বা হালকা স্ট্রেচ করুন (যেমন ওয়াল অ্যাঙ্গেলস বা মিড-ব্যাক টুইস্ট)।
দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে নড়াচড়ার অভ্যাস যুক্ত করুন। যেমন, সকাল ও রাতে দাঁত ব্রাশ করার সময় এক পায়ে ভারসাম্য রেখে দাঁড়ানো অথবা প্রতিবার হাত ধোয়ার সময় পাঁচটি স্কোয়াট করা।
মন-শরীর সংযোগ
সকালে ঘুম থেকে উঠে ছয়বার ধীরে ও দীর্ঘভাবে শ্বাস নিলে সারাদিনের জন্য একটি শান্ত ও স্থিতিশীল মানসিক ভিত্তি তৈরি হয়।
মন–শরীর সংযোগের অনুশীলনগুলো শারীরিক অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। এগুলো শরীর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়, মন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, চাপ কমায় এবং ঘুমের মান উন্নত করে। এর ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ে এবং সামগ্রিক সুস্থতার অনুভূতিও উন্নত হয়।
চেষ্টা করার জন্য কিছু উপায়-
দিনের শুরুতে গ্রাউন্ডিং মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন করুন-পা মেঝেতে রেখে বসে।
রাতে বিছানায় শুয়ে, লাইট বন্ধ করার পর পেশি শিথিলকরণের কিছু ব্যায়াম অনুশীলন করুন।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে জার্নালিং করুন-দিনটি কেমন কেটেছে এবং শরীরে কী ধরনের অনুভূতি হয়েছে, সেই ছোট বিষয়গুলোও লিখে রাখুন।কীভাবে মূল অভ্যাসকে স্থায়ী করা যায়
শুধু ভালো অভ্যাস বেছে নিলেই যথেষ্ট নয়, সেগুলোকে নিয়মিত করা সবচেয়ে জরুরি। গবেষণা বলছে, কোনো অভ্যাস দীর্ঘস্থায়ী হয় যখন তা পরিবেশ, সংকেত এবং দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই ক্ষেত্রে কার্যকর একটি কৌশল হলো Habit Stacking-অর্থাৎ নতুন অভ্যাসকে পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় জিনিস চোখের সামনে রাখা, ফোনে রিমাইন্ডার সেট করা বা পরিবেশকে সহায়ক করে তোলাও অভ্যাস গঠনে সাহায্য করে।
কেন একটি কি-স্টোন অভ্যাসও যথেষ্ট হতে পারে
আদর্শভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি করে মূল অভ্যাস ভালো ফল দেয়। তবে বাস্তবে, ভালোভাবে বাছাই করা একটি অভ্যাসই জীবনে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। মূল অভ্যাস ধীরে ধীরে ইতিবাচক গতি তৈরি করে, যা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত করে দেয়।
নিয়মিত ছোট কাজই শেষ পর্যন্ত চিন্তা, চলাফেরা এবং অনুভূতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলে-এমন পরিবর্তন যা কয়েক সপ্তাহে হারিয়ে যায় না, বরং সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়।