|
প্রিন্টের সময়কালঃ ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১২ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৩:২৫ অপরাহ্ণ

আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার: টিআইবি


আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার: টিআইবি


সংস্কারের নামে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত আটটি অধ্যাদেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, ঘোষিত সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার প্রায় সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে এবং কার্যত আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
 

সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
 

তিনি বলেন, “সংস্কারের নামে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নে ব্যর্থতা দেখা গেছে। সরকার কার্যত আমলাতন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করেছে। কেন এই আত্মসমর্পণ হলো এবং দুর্বলতা কোথায়—এটাই মূল প্রশ্ন। তবে সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকায় এর নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন।”
 

সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ নিয়ে টিআইবির বিশদ পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হয়।
 

টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংস্কারের জন্য খাত বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণে কোনো সুস্পষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়নি। ১১টি কমিশন ও কমিটির বাইরে শিক্ষা, কৃষি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত কেন বাদ পড়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর কর্মপরিকল্পনাও প্রণীত হয়নি।
 

সংস্থাটি আরও জানায়, শুরু থেকেই সংস্কারবিরোধী শক্তিকে চিহ্নিত ও প্রতিহত করার গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়নি। বরং এসব অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল হয়েছে এবং সংস্কারপরিপন্থী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এমনকি জুলাই সনদ যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
 

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে একতরফাভাবে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য কেবল দায়সারা ভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের চর্চা গড়ে তুলতে পারেনি।
 

আমলাতন্ত্রের প্রভাবের উদাহরণ তুলে ধরে টিআইবি জানায়, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও এনজিও খাতে বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংস্কারবিরোধী মহল, বিশেষ করে প্রভাবশালী আমলাদের অন্তর্ঘাতমূলক ভূমিকার কারণে সংস্কার লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে। এতে আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র ও জবাবদিহিহীন কর্তৃত্ব বজায় রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
 

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে টিআইবি দাবি করে, যেভাবে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে স্বাধীন পুলিশ কমিশনের ধারণা কার্যত ধুলিস্যাৎ হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই অধ্যাদেশ পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের পরিবর্তে তা সুরক্ষার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ সম্পর্কেও টিআইবি বলেছে, খসড়া প্রণয়নে সম্পৃক্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের অন্ধকারে রেখে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ফলে এটি আন্তর্জাতিক মানের আইন হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।
 

সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে কিছু ইতিবাচক ও যুগোপযোগী বিধান থাকলেও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার মতো ব্যাপক নজরদারির সুযোগ রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
 

দুদক সংস্কার প্রসঙ্গে টিআইবি অভিযোগ করে, কমিশনের আশু করণীয় সুপারিশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দুদকের পূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল বা রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো দ্বিমত ছিল না।
 

গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদ থাকলেও বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল সিদ্ধান্ত সেখানে নেওয়া হয় না। কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বা কোন ধারা থাকবে—এসব রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা মহল নির্ধারণ করে।”
 

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত শক্তিগুলোই নীতিগত নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির বিরোধিতা করে এবং সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
 

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামানসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬