চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাজীর পাড়ার বাসিন্দা রাসেল আহমেদ। জরাজীর্ণ মাটির ঘরে বসবাস করা এই শয্যাশায়ী ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। চার বছর আগে সাহায্য দেওয়ার কথা বলে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ করা হলেও কোনো সহায়তা পাননি তিনি। অথচ ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী শাখায় তাঁর নামে সৃষ্টি হয়েছে ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকার ঋণ।
ব্যাংকের নথিতে রাসেল আহমেদকে ‘রাসেল এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক দেখিয়ে ২০২২ ও ২০২৩ সালে এই ঋণ অনুমোদন করা হয়। তবে রাসেল বলেন, তিনি কোনোদিন ওই ব্যাংকে যাননি, এমনকি কোনো ব্যাংক হিসাবও খোলেননি।
রাসেলের মতোই দিনমজুর, ভ্যানচালক ও কৃষক—এমন ১০২ জন হতদরিদ্র মানুষের নামে ইউসিবির চট্টগ্রামের পাঁচটি শাখা থেকে মোট ৯৬৩ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী ছিলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তাঁর পরিবারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউসিবির চকবাজার শাখা থেকে ৫০ জনের নামে ৪৪৯ কোটি, পাহাড়তলী শাখা থেকে ২২ জনের নামে ১৯৫ কোটি, বন্দর শাখা থেকে ১৩ জনের নামে ১৬৬ কোটি এবং বহদ্দারহাট ও খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১৭ জনের নামে ১৫৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ দেওয়া হয় ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে।
ঋণের নোটিশ পাওয়ার পর অনেক পরিবারে শুরু হয়েছে অশান্তি। কক্সবাজারের রামু ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা জানান, সাহায্যের কথা বলে পরিচিত বা অপরিচিত লোকজন তাঁদের এনআইডি সংগ্রহ করে। কয়েক মাস পর ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণের নোটিশ আসতে শুরু করে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তদন্তে জানায়, এসব ভুয়া অ্যাকাউন্টে ঋণের অর্থ জমা হওয়ার পর তা নগদ উত্তোলন করে জাবেদ পরিবারের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া এলসি খুলে অর্থ দুবাইয়ে পাচারের প্রমাণও মিলেছে।
বিএফআইইউ ইতোমধ্যে ইউসিবির চকবাজার, পাহাড়তলী ও বন্দর শাখা পরিদর্শন করে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিবেদন দিয়েছে। পরিদর্শনে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জাল নথি তৈরি করে কোনো ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেছেন।
জালিয়াতির ঘটনায় দুদক একাধিক মামলা করেছে। এসব মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদ, তাঁর পরিবারের সদস্য, ইউসিবির কর্মকর্তাসহ ৬৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ইউসিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে ব্যাংকটির দাবি, জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঋণ বিতরণের আগে নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়নি। দিনমজুরদের নামে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া স্রেফ জালিয়াতি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত সুবিধাভোগীদের নামে ঋণ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “একক কোনো ব্যক্তি এভাবে ঋণ নিতে পারে না। এখানে পুরো একটি চক্র ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা রয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ভুক্তভোগীদের আইনি প্রক্রিয়ায় ঋণের জাল থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।”
সরকার পতনের পর থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশছাড়া। বিদেশে বিপুল সম্পদের অভিযোগ তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। এ ঘটনায় ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।