ময়মনসিংহে দিনে-রাতে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং, চরম দুর্ভোগ
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
তীব্র গরমের মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। এতে ঘরবাড়িতে স্বস্তি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, অনলাইনকর্মী, মাছচাষি ও পোল্ট্রি খামারিরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুপুরের তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। সন্ধ্যার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। একবার বিদ্যুৎ এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যাচ্ছে। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না। শহরের তুলনায় পল্লি ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি বলে জানিয়েছেন তারা।
ত্রিশাল উপজেলার কোনাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মামুনুর রশীদ বলেন, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
শুধু ত্রিশাল নয়, বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। দিনের প্রচণ্ড গরমের পর রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট হচ্ছে বেশি। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রচণ্ড গরমে ময়মনসিংহ জোনে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পিডিবির ময়মনসিংহ দক্ষিণ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগে অফ-পিক সময়ে চাহিদা ৪৫০ থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট, পিক সময়ে ৫০০ থেকে ৫২০ মেগাওয়াট এবং দিনের অন্যান্য সময়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
এই ঘাটতির অন্যতম কারণ ময়মনসিংহের গুদারাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকা। ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার কেন্দ্রটিতে গ্যাসের সংকটে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রমেও। বিদ্যুৎনির্ভর ছোট কারখানা, দোকান ও রেস্তোরাঁয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় বিক্রি কমছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।
অনলাইন ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরাও সমস্যায় পড়েছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগও বিঘ্নিত হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারছেন না শিক্ষার্থী ও অনলাইনকর্মীরা।
মৎস্য খাতেও পড়েছে লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব। ত্রিশালের ধানিখোলা গ্রামের মাছচাষি জাহিদ হাসান জানান, দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে মাছের বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রেণু-পোনা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতরা বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
পোল্ট্রি খামারেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের ব্রয়লার খামারি নজরুল ইসলাম বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে বাচ্চা খাবার খায় না, আবার দিনে অতিরিক্ত গরমে হাঁপাতে থাকে। এতে হিটস্ট্রোকে অনেক বাচ্চা মারা যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সামাজিক সংগঠন ‘ময়মনসিংহ মঞ্চ’-এর সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের পড়াশোনা, আয়-রোজগার, উৎপাদন ও জীবিকা জড়িত। বিশেষ করে পল্লি এলাকার মানুষের জন্য এটি প্রতিদিনের বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবু নাসের জানান, তাদের এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। ফলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এজিএম মো. মুকুল হোসেন বলেন, তাদের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ৩০০ মেগাওয়াটের বেশি। পিক ও অফ-পিক মিলিয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদ জানান, তাদের এলাকায় চাহিদা ৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। অতিরিক্ত গরমে পিক সময়ে ৪০ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি থাকছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ময়মনসিংহ গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক বলেন, সন্ধ্যার সময়ে ময়মনসিংহ জোনের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দিনের বিভিন্ন সময়ে চাহিদার ওপর নির্ভর করে লোডশেডিংয়ের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। পিক সময়ে লোডশেডিং বেশি এবং অফ-পিক সময়ে তুলনামূলক কম থাকে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে লোডশেডিং কমিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া না যাওয়ায় আপাতত গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক) | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬