অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থীশিবির কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বিভিন্ন সময়ে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এই শিবিরে আশ্রয় নেয়। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ এই আশ্রয়শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘের মহাসচিবকে পাশে রেখে এদিন ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘আগামী রোজার ঈদ আপনারা নিজ দেশেই করতে পারবেন।’
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আশাজাগানিয়া এই বক্তব্যে নিজ দেশে ফেরার নতুন স্বপ্ন দেখেছিলেন কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের একটি ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা সৈয়দ নূর (৬৫)। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডং থেকে পরিবারের আট সদস্য নিয়ে তিনি পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। রাখাইনের সচ্ছল সৈয়দ নূরের পরিবার পৌনে ৯ বছর ধরে আশ্রয়শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
সৈয়দ নূর বলেন, ‘দেশে বাড়ি-জমি সব ছিল। আমাদেরকে উচ্ছেদ করে জান্তারা সব দখলে নিয়েছিল। এখন সব আরাকান আর্মির দখলে। গত বছর ইউনূস সাহেব জাতিসংঘের মহাসচিবসহ এসে ওয়াদা দিয়েছিলেন এই বছর দেশে ফেরত পাঠাবেন। কিন্তু কই, কিছুই তো হলো না।’
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে থাকা প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গাও নূরের মতো ভাবছেন ‘কই, কিছুই তো হলো না। বরং স্বদেশে প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তাহীনতা, চলমান গৃহযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং অর্থায়ন-সংকটের কারণে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাই আজ ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো সুখবর নেই। পৌনে ৯ বছরের বেশি সময় ধরে আশ্রিত এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন এখনো শুধু মুখে মুখেই।’
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বিশ্বের বৃহত্তম বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বসবাস গড়ে উঠেছে। ২০২৩ সাল থেকে আড়াই বছরে আরও ১ লাখ ৫২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার অন্যতম কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের বড় অংশে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরা সম্ভব হচ্ছে না।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মো. জুবায়ের বলেন, প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই। সেখানে এখন আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে অভিযান চালাচ্ছে।’
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থান, মজুরি ও সম্পদ ব্যবহারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বনভূমি উজাড়, পাহাড় ক্ষয় এবং পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাবও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
আশ্রয়শিবিরে দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা কর্মসূচিতে চাপ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বারবার সতর্ক করে বলছে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পেলে শিবিরে মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তবে বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ১৪ মিলিয়ন ইউরো (১ কোটি ৪০ লাখ ডলার) সহযোগিতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ হাজার নতুন রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য যে ধরনের ব্যবস্থা করা দরকার, সেটি করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে নিজ দেশে ফেরাতে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ অনুকূল নয়।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। খুন, অপহরণ, মানব পাচার, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে কিছু রোহিঙ্গা জড়িয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল জেলার আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে খুন, অপহরণ, মাদক কারবার ও মানব পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’ এ জন্য তিনি প্রশাসনকে আরও নজরদারি ও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন এবং প্রয়োজনে ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের আটকের দাবি জানান।
গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘ইকোসক হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স সেগমেন্ট’-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের টেকসই ও দ্রুত প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই সংকটের স্থায়ী সমাধান নিহিত। এই সমাধান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরবচ্ছিন্ন এবং সক্রিয় সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬