বন্যায় ধানের সঙ্গে খড়ও গেছে, গোখাদ্য সংকটে বিপাকে কৃষকরা
বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে কিছু পাকা ধান কাটতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয় সপ্তাহেই শুরু হয় টানা বৃষ্টি, যেন শনি নেমে আসে তাদের পাকা ধানের ওপর। এতে হাওরে থাকা বাকি ধান তলিয়ে (নিমজ্জিত) আর বৃষ্টিতে পচে যাওয়া ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের কৃষক। এ ছাড়া যে ধান কেটেছিলেন সেগুলোও কিছুটা রোদে শুকাতে না পারায় অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়েছে। এর সঙ্গে নষ্ট হয়েছে ধানের খড়।
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে উৎপাদন ও শ্রমিকের খরচ বহুগুণ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম তলানিতে। সরকারি খাদ্য গুদামেও আর্দ্রতার অজুহাতে ধান দিতে পারছেন না কৃষক। তবে মিল মালিকরা চাল দিচ্ছেন। গোখাদ্যের অভাবে হাওরাঞ্চলের মানুষ গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন।
মোহনগঞ্জ বড়তলী বানিয়াহারি ইউনিয়নের বড়তলী গ্রামের কৃষক জীবন কৃষ্ণ বলেন, ‘চাতল হাওরে তিনকানি ক্ষেত করছিলাম। পইলা (প্রথম) মেঘের মধ্যে বাপ-ছেলে আমরা এক কানি ক্ষেত কাটছিলাম। অহন এই ধান ব্যাপারিও নেয় না, সরকারও নেয় না। কিতা করতাম!’
তিনি আরও বলেন, এ তিনকানি জমি চাষ করতে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। যে এককানি কাটা হয়েছে মেঘের মধ্যে, সেই ক্ষেতে ৪০ মণ ধান হয়েছে। বর্তমানে ৭০০ টাকা ধরে ৪০ মণের দাম ২৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা কিস্তি নিয়েছিলাম। সেটা পরিশোধ করতে গিয়ে ২৮ হাজার টাকার ধান বিক্রি করেছি। চেষ্টা করেও সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেননি বলে জানান এ কৃষক। একই কথা আরেক কৃষক বাঁধন সরকারের। বললেন, ‘আমাদের ধান সরকারও নিতো না, আবার গরু-বাছুর বেচে মহাজনের ঋণ শোধ করতে হবে, না খাইয়া থাকতে হবে।’
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, একর প্রতি ২০-২৪ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে কৃষককে। এদিকে সরকারি ক্রয়মূল্য মণ প্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ থাকলেও তার সুফল পাচ্ছে না চাষি। কৃষকের অভিযোগ, গুদামে ধান দিতে গেলে আর্দ্রতা পরিমাপ এবং ব্যাংক হিসাবের জটিলতায় পড়তে হয়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান বলেন, ধান সংগ্রহের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। শুকাতে না পারায় কৃষকের ধানে আর্দ্রতা পাওয়া গেছে ২০-২২ শতাংশ। গত এক সপ্তাহের বেশি সময় সরকারি খাদ্য গুদামে ২৪ টন ধান আটজন কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সময়ে মিলারদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮০০ টন চাল সংগ্রহ করা হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ জেলা-উপজেলা সব সরকারি খাদ্য গুদামে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার মোট বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে। অতিবৃষ্টিতে (নিমজ্জিত) হয়েছে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৬৫ হেক্টর জমির ধান। উৎপাদনে মোট ক্ষতি ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ টন; যার আর্থিক মূল্য ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৭৭ হাজার ৩৬৩ জন।
জলাবদ্ধতায় ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে গবাদিপশুর প্রাকৃতিক খাদ্য খড়ও পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এবার তাই গোখাদ্যের সংকট হবে। বিষয়টি আমরা কতৃপক্ষকে জানিয়েছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় হাওরে প্রায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪ কৃষক আছেন। প্রায় সবাই চাষাবাদের জন্য জমির অনুপাতে গরু লালন-পালন করেন। ভাটিতে প্রাকৃতিক এই খড় দিয়ে বর্ষাকালীন ছয় মাস গবাদিপশুকে লালন-পালন করেন কৃষক। বাকি ছয় মাস শুকনো মৌসুমে গোচারণ ভূমিতে গবাদিপশুকে চড়ান তারা।
প্রতি বছর সনাতন পদ্ধতিতে কৃষকরা ধান শুকিয়ে গোলাজাত করার পর খড় শুকিয়ে খলায় ছড়ানো খড় বাড়িতে নিয়ে উঠোনে বা উঁচু জায়গায় গম্বুজাকৃতির আদলে স্তূপ করে কৃষকরা সংরক্ষণ করে রাখেন। একে খড়ের ‘গম্বুজ’ বা ‘খড়ের লাছি’ বলা হয়। তখন এক কৃষক আরেক কৃষককে বিনা পারিশ্রমিক ‘খড়ের লাছি’ তৈরি করে দেন। তখন উৎসবের মত হয়। রেওয়াজ আছে, খড়ের লাছি উৎসবের মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাপক খাওয়া-দাওয়া করা হয়। কিন্তু এবার সেই উৎসব হবে না হাওরে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। খড় পচে যাওয়ায় সেটা সম্ভব নয় বলে করেন।
খড়ের খালি মাচার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন কৃষক মো. দিলাল মিয়া বলেন, গোয়ালঘরে বাঁধা সাতটি গরু বারবার ডাকছে খাবারের জন্য; কিন্তু সামনে দেওয়ার মতো শুকনো খড় নেই। মাঠে নেই সবুজ ঘাস। বন্যায় হাওরের মাঠে এখন পানি, খলায় ভেজা ধান, খড়ও পচে গেছে। আবার বাজারে খড়ের অস্বাভাবিক দাম-সব মিলিয়ে বন্যায় ধান হারানো এ কৃষকের এখন গরু বাঁচানোই বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ধান হারিয়ে সব গেছে, সংসারের শেষ সম্বলটাও এবার যাইবো, আবার খাওয়াইতেও পারতেছি না, এখন খড়ের জন্য গরু বিক্রি কইরা দিতে অইবো’-বলছিলেন দিলাল মিয়া। অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে এবার শুধু বোরো ফসলই নয়, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে সংকট তৈরি হয়েছে গোখাদ্যেরও। সময়মতো ধান কাটতে না পারা, খড় ভিজে নষ্ট হওয়া এবং মাঠে পানি জমে থাকায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকটে পড়েছেন হাজারো কৃষক ও খামারি। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর প্রভাব আসন্ন ঈদে কোরবানির পশুর হাটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
পানুর গ্রামের জনতা এগ্রো ফার্মের মালিক গোলাম মোস্তফা বলেন, সাড়ে ৭ মাস থেকে ৮ মাস গরুগুলো খামারে রেখে লালনপালন করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে পোস্টের মাধ্যমে বিক্রি করার চেষ্টা করছি। গোখাদ্যের সংকট এবং কোরবানি হাটের আগেই ভাল দামের আশায় বিক্রি করে দিব।
উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুকানোর জায়গা না থাকায় অনেক কৃষক খড় সংরক্ষণ করতে পারেননি। কোথাও কোথাও সেগুলো পানিতে পচে কালচে হয়ে গেছে। এ ছাড়া হাওরে পানি আসায় কাঁচা ঘাসও নেই এখন। এতে অল্প পরিমাণ খাদ্য খাইয়ে পশুগুলোকে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখছেন তারা। অনেক কৃষক আবার খড়ের অভাবে গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন।
মোহনগঞ্জ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উৎপল সরকার বলেন, উপজেলায় ২১৭টি গরুর খামার, আর দুগ্ধ খামারি ৪৫টি রয়েছে। ৬১ হাজার কৃষকের খড় সংরক্ষণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিকল্প গোখাদ্য উৎপাদন এবং দুর্যোগকালীন সহায়তা ছাড়া এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ হতে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, হাওরের অতিবৃষ্টিতে ধান যেমন পচে গেছে, খড় পচেও গোখাদ্যের সাময়িক সংকট হচ্ছে। তাছাড়া হাওরের ক্ষয়ক্ষতি পূর্ণাঙ্গ হিসাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কৃষকের বিকল্প খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ঘাস চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬