|
প্রিন্টের সময়কালঃ ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০৪ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:১৯ অপরাহ্ণ

শিক্ষকতাকে মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশা করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী


শিক্ষকতাকে মেধাবীদের প্রথম পছন্দের পেশা করতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী


নিজস্ব প্রতিবেদক

 

শিক্ষকতাকে মেধাবী ও যোগ্য তরুণদের প্রথম পছন্দের পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
 

তিনি বলেছেন, শিক্ষকতা কোনোভাবেই ‘উপায়হীন বিকল্প’ কিংবা সাধারণ চাকরির মতো একটি পেশা হতে পারে না। শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি গভীরভাবে জড়িত। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়।
 

সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
 

এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা সুরক্ষার ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’।
 

প্রধানমন্ত্রী দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের অভিনন্দন জানান।
 

তিনি বলেন, শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন ও প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষা ও দীক্ষার মাধ্যমে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে। পারিবারিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান আদর্শ। তাই শিক্ষকেরা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের এই সময়ে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির পাশাপাশি কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এজন্য শিখন ও শিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা এবং সময়োপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে।
 

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের মধ্যে ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’—এই প্রশ্নগুলো জাগিয়ে তুলতে হবে। কৌতূহল তৈরি হলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।
 

‘আনন্দময় শিক্ষা’ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ে আনন্দভিত্তিক শিক্ষা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে নতুন একটি বই দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ ধরনের বই চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
 

শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে আরও বিস্তৃত করেছে। ফলে শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোকে আরও আধুনিক করা প্রয়োজন।
 

তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার বিকল্প হিসেবে নয়, শিক্ষকের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ ও বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।
 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে কেউ ঝরে পড়লেও যাতে বেকার হয়ে না থাকে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
 

শিক্ষা খাতকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
 

মাধ্যমিক শিক্ষার বর্তমান চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তিন লাখের বেশি শিক্ষক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। এ পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশ বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
 

শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সমান সুযোগ পায়, সে জন্য সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা সংস্কারের মূল ভিত্তি হবে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার।
 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্মমুখী শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে তা সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হতে পারে।
 

সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মান—এসব মূল্যবোধকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পরিবারের পর শিক্ষক-শিক্ষিকারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন।
 

শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শিক্ষকতা পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
 

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। চলতি বছর থেকে একটি নীতিমালার আওতায় এসব অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্তত একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
 

তিনি বলেন, একজন শিক্ষক কর্মরত থাকুন কিংবা অবসর জীবনে থাকুন—তাঁর মহান পেশার কারণেই তিনি আমৃত্যু রাষ্ট্রের কাছে সম্মানীয়।
 

শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষককে শুধু বেতন বা অবসরভাতার জন্য অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। যথাসময়ে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।
 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে দেশের শিক্ষকরা অন্যতম প্রধান শক্তি। তাঁদের মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
 

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক)     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০২, লেভেল #০২, মাহতাব সেন্টার , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ১৭৭ , বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬