জলবায়ু সংকট ও প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ফসল
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এ দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তিই হলো ধান চাষ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি খাতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা এবং ঋতু পরিবর্তনের খামখেয়ালিপনায় প্রতি মৌসুমে দেশের প্রধান দুটি ধানের ফসল বোরো ও আমন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং তীব্র ঝড়ের কবলে পড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ টন ধানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের চালের বাজারে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম যুগে কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
১. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ধান চাষে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি: এক নির্মম বাস্তবতা
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্যোগের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা ধান চাষের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে।
ক) আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে হাওর এলাকাকে দেশের ‘ধানের ভাণ্ডার’ বলা হয়। বোরো মৌসুমে এই অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদিত হয়, যা দেশের সামগ্রিক চাহিদার বড় অংশ জোগান দেয়। কিন্তু প্রতি বছর চৈত্র-বৈশাখ মাসে ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে উজান থেকে নেমে আসে তীব্র পাহাড়ি ঢল।
এই ঢলের কারণে হাওরের বাঁধগুলো ভেঙে ফসলের মাঠ তলিয়ে যায়। কৃষকের সারা বছরের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল, আধা-পাকা বোরো ধান মুহূর্তের মধ্যে পানির নিচে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে নিজের স্বপ্ন বিলীন হতে দেখে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
খ) তীব্র ঝড় ও অতিবৃষ্টির তাণ্ডব
শুধু আগাম বন্যাই নয়, আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই আবহাওয়ার চরম রূপ দেখা যায়। মৌসুমের শুরুতে যখন কৃষকেরা বীজতলা তৈরি করেন, তখন অনেক সময় অসময়ের অতিবৃষ্টির কারণে বীজতলা পচে নষ্ট হয়ে যায়। আবার ধান যখন পাকার সময় হয়, ঠিক তখনই কালবৈশাখী ঝড় বা লঘুচাপের কারণে সৃষ্ট ভারী বর্ষণ ও দমকা হাওয়া আঘাত হানে।
ঝড়ের তীব্রতায় পাকা ধান গাছ মাটিতে শুয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় জমিতে পানি জমে থাকায় ধান চিটা হয়ে যায়, ধানের গুণগত মান নষ্ট হয় এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়।
গ) তীব্র শ্রমিক সংকট ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা
যেকোনো আকস্মিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার পর কৃষকদের মধ্যে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার তাড়াহুড়ো পড়ে যায়। কিন্তু এই জরুরি সময়ে গ্রামগঞ্জে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। শ্রমিকের মজুরি আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় প্রান্তিক চাষিদের পক্ষে ধান কাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, আধুনিক কৃষির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো 'কম্বাইন হারভেস্টার' বা আধুনিক ধান কাটার যন্ত্র। তবে আমাদের দেশে প্রচলিত অধিকাংশ যন্ত্রই কাদা বা পানিতে নামতে পারে না। ফলে দুর্যোগের সময় যখন দ্রুত ধান কাটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাঠের ধান মাঠেই পচে নষ্ট হয়।
২. ধানের ক্ষতি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি
কৃষকের এই ব্যক্তিগত ক্ষতি কেবল একক কোনো পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলায় বড় ধরনের আঘাত হানে।
কৃষকের ঋণের জাল: প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় একদিকে যেমন কৃষকরা নিঃস্ব হচ্ছেন, অন্যদিকে তারা মহাজন ও বিভিন্ন এনজিওর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। এক মৌসুমের ক্ষতি কাটাতে না কাটাতে পরবর্তী মৌসুমের জন্য আবার ঋণ নিতে বাধ্য হন তারা, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব: ধান উৎপাদন ব্যাহত হলে তার সরাসরি ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে চালের বাজারে। উৎপাদন কম হওয়ায় জোগান কমে যায় এবং চালের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংকট: চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। তাদের আয়ের একটি বড় অংশ শুধু চাল কিনতেই শেষ হয়ে যায়, যার ফলে পুষ্টিকর অন্যান্য খাদ্য উপাদান ক্রয়ের সক্ষমতা কমে যায়।
আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি: দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকারকে বাধ্য হয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চাল আমদানি করতে হয়, যা দেশের সামগ্রিক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
৩. দুর্যোগ মোকাবিলা ও উত্তরণের কার্যকর উপায়
জলবায়ু পরিবর্তনকে পুরোপুরি থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। কৃষি বিশেষজ্ঞরা এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন:
ক) আধুনিক ও নির্ভুল আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও নিখুঁত আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ফসলের ক্ষতি রক্ষা করা সম্ভব। এর জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে ডিজিটাল ডিসপ্লে বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অন্তত ১০-১৫ দিন আগেই কৃষকদের কাছে আবহাওয়ার সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা ধান পাকার সাথে সাথেই তা কেটে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারেন।
খ) জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের জাতের আবাদ
কৃষি খাতের সুরক্ষায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে বিজ্ঞান। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ইতিমধ্যে বেশ কিছু চমৎকার ও দুর্যোগ-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে।
বন্যা-সহনশীল জাত: বন্যাপ্রবণ ও হাওর অঞ্চলে ‘ব্রি ধান৫১’ এবং ‘ব্রি ধান৫২’ চাষ করা যেতে পারে। এই জাতগুলো পানির নিচে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডুবে থাকলেও নষ্ট হয় না।
স্বল্পমেয়াদি জাত: বোরো মৌসুমে আগাম বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ‘ব্রি ধান৮২’ বা এই জাতীয় স্বল্পমেয়াদি ধানের চাষ বাড়ানো উচিত, যা পাহাড়ি ঢল আসার আগেই পেকে যায় এবং কৃষকেরা নির্বিঘ্নে ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেন।
গ) আপৎকালীন বিকল্প ফসল চাষের ওপর জোর
বন্যা বা ঝড়ে যদি কোনো কারণে ধান পচে যায় বা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, তবে কৃষকদের ভেঙে পড়লে চলবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় পরামর্শ ও সহায়তায় দ্রুত জমি তৈরি করে শাকসবজি, সরিষা, ভুট্টা বা স্বল্পমেয়াদি ডাল জাতীয় ফসল আবাদ করতে হবে। এতে করে ধানের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা দ্রুত বিকল্প ফসল বিক্রির মাধ্যমে কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ঘ) টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা
দুর্যোগের সময়ে দ্রুত ধান কাটার জন্য শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যান্ত্রিকীকরণ বাড়াতে হবে। কাদা ও পানিতেও চলতে পারে- এমন আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির কম্বাইন হারভেস্টার আমদানির ওপর জোর দিতে হবে।
ভর্তুকি বৃদ্ধি: হাওর ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারি বড় ধরনের ভর্তুকিতে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বিনামূল্যে উপকরণ বিতরণ: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরবর্তী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে উন্নত মানের বীজ, সার এবং সহজ শর্তে বা বিনাসুদে কৃষি ঋণ প্রদান করতে হবে।
শস্য বীমা: প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে 'শস্য বীমা' ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এর ফলে ফসল নষ্ট হলেও কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং পুরোপুরি নিঃস্ব হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন।
একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশা
জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র চ্যালেঞ্জের যুগে দেশের কৃষি খাত তথা ১৭ কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে থাকা বোকামি হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষি বাঁচলে বাঁচবে দেশ। তাই ধানের উৎপাদন ঠিক রাখতে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব সেচ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সচেতনতার এক সমন্বিত উদ্যোগই কেবল পারে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে একটি দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে রূপান্তরিত করতে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬