ভোটের মাঠে ক্যামেরার চোখ মুরাদনগরের ১৫৯ কেন্দ্রে বসানো হয়েছে ৯৫৪ সিসি ক্যামেরা
রায়হান চৌধুরী, মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:
ডিজিটাল নজরদারিতে ভাঙবে কি আস্থার সংকট?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর জোর দিচ্ছে প্রশাসন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে কুমিল্লার মুরাদনগরে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের ১৫৯টি ভোটকেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে মোট ৯৫৪টি সিসি ক্যামেরা। ভোটের দিন ব্যালটের পাশাপাশি সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এই ‘ক্যামেরার চোখ’—যার আওতায় পুরো এলাকা থাকবে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোটকেন্দ্রের প্রবেশপথ, ভোটকক্ষের সামনের এলাকা এবং ব্যালট সংরক্ষণ কক্ষ—ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এসব স্থানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ভোটগ্রহণ চলাকালে ক্যামেরাগুলোর লাইভ ফুটেজ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে। কোনো অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা সন্দেহজনক তৎপরতার আভাস মিললেই সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা হবে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অতীতে মুরাদনগরের কিছু এলাকায় নির্বাচন মানেই ছিল উত্তেজনা, কেন্দ্র দখল, জালভোট ও সংঘর্ষের অভিযোগ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার প্রশাসন আগেভাগে কঠোর প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে গড়ে ৫ থেকে ৭টি করে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নির্দিষ্ট মনিটরিং টিম এসব ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ভোট শেষে প্রয়োজনে ফুটেজ সংরক্ষণ ও পর্যালোচনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, নজরদারি শুধু ভোটারদের নিরাপত্তার জন্য নয়—ভোট পরিচালনায় যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমও এর আওতায় থাকবে। এতে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির সুযোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বেদারুল ইসলাম বলেন, “ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। সিসি ক্যামেরা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করবে।”
উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, “সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। কেউ যেন ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে—এ বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি।”
এলাকাবাসীর বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কেন্দ্র দখল, জালভোট ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি অনেকটাই কমবে। তবে ভোটারদের একাংশের প্রশ্ন—ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও যদি অনিয়ম হয়, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে? প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রশাসনিক দৃঢ়তা কতটা থাকবে, সেটিই বড় পরীক্ষা।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, মুরাদনগরের সব ভোটকেন্দ্রই স্থায়ী। মোট ভোটকক্ষ ৯৩৩টি। উপজেলায় মোট ভোটার ৪ লাখ ৯১ হাজার ২২৮ জন—এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯৮ জন, নারী ২ লাখ ৪১ হাজার ২২৬ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪ জন। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন ৯ হাজার ৪৯৮ জন ভোটার; এর মধ্যে পুরুষ ৮ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ৫৯১ জন।
নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
সব প্রস্তুতি, প্রযুক্তি আর আশ্বাসের পরও প্রশ্ন রয়ে যায়—ডিজিটাল নজরদারি কি মুরাদনগরে সুষ্ঠু ভোটের নতুন ইতিহাস গড়তে পারবে, নাকি ফলাফলের দিন আবারও ভেসে উঠবে পুরোনো অভিযোগ? এর উত্তর মিলবে ভোটগ্রহণের দিনই।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬