বিশ্ব কিডনি দিবস আজ
রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও রোগীর প্রতি সহানুভূতি আছে এমন কারও ‘ইমোশনাল ডোনার’ হিসেবে অঙ্গ দানের সুযোগ রেখে আইন সংশোধন করা হয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশের চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপন হয়নি। এ ব্যাপারে কয়েকটি আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচারণার অভাবে অনেকে এখনও বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। এদিকে কিডনি জটিলতায় চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।
গত বছরের ১৯ নভেম্বর মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য নিকটাত্মীয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং ‘ইমোশনাল ডোনার’ থেকে অঙ্গ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আগের আইনে নিকটাত্মীয়ের সংখ্যা ছিল ২২। নতুন অধ্যাদেশে তা বাড়িয়ে ৩০ করা হয়েছে। এর মধ্যে পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও রক্তসম্পর্কিত চাচা, ফুফু, নানা-নানি, দাদা-দাদি, নাতি-নাতনি, চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো ও খালাতো ভাইবোন, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগনে-ভাগনি এবং সৎ ভাই বা বোন অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
এই নিকটাত্মীয় ছাড়াও নতুন অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ‘ইমোশনাল ডোনার’ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন। এজন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। দাতার বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে, মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে এবং সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় সম্মতি দিতে হবে। কোনো ধরনের আর্থিক প্রলোভন, চাপ বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকা যাবে না। গ্রহীতার নিকটাত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের পরিচিত হতে হবে এবং তাঁকে নিঃস্বার্থ দাতা হিসেবে নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সুপারিশ থাকতে হবে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তি, আর্থিক প্রলোভনে অঙ্গ দানে আগ্রহী ব্যক্তি কিংবা এমন কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, যা তাঁকে দাতা হিসেবে অনুপযুক্ত প্রমাণ করে তারা ইমোশনাল ডোনার হতে পারবেন না।
ইমোশনাল ডোনার নির্ধারণ ও অনুমতির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন আইন সংশোধনের পর ‘ইমোশনাল ডোনার’-এর মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য অনেকেই আবেদন ফরম সংগ্রহ করছেন। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কয়েকটি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এ সেবাকে অটোমেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দেশের যে কোনো স্থান থেকে অনলাইনে আবেদন করা যায়। তবে এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা এখনও কম। বিষয়টি নিয়ে প্রচার চালানো জরুরি। তাঁর মতে, দেশের ভেতরেই ইমোশনাল ডোনারের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের সংখ্যা বাড়িয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা কমানোই তাদের মূল লক্ষ্য। রোগীরা যেন কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য না হন, সে ব্যবস্থাই গড়ে তুলতে চায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসকরা জানান, দেশে কিডনি রোগে আক্রান্ত প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হচ্ছে। নতুন রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে বা বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।
এ পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণী’।
বর্তমানে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০০টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ফাউন্ডেশন, সিকেডি ও জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে ট্রান্সপ্লান্ট করা হচ্ছে। ১৯৮২ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে প্রায় চার হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কিডনি ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট শুরু করলেও গত বছর একটিও ক্যাডাভেরিক প্রতিস্থাপন হয়নি। কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, নিকটাত্মীয়ের পরিধি বাড়ানোর ফলে কিডনি প্রতিস্থাপনের গতি কিছুটা বেড়েছে। তবে ইমোশনাল ডোনার নিয়ে কিছু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে তাদের প্রতিষ্ঠান ইমোশনাল ডোনার থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, এতে অনৈতিক কিছু ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া বিতর্কিত হয়ে পড়তে পারে। এতে ভারত ও পাকিস্তানের মতো বৈধ প্রক্রিয়ার আড়ালে অবৈধ ট্রান্সপ্লান্ট বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের কেন্দ্র বাড়ানো এবং সেবার পরিসর বিস্তৃত করা জরুরি।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, নীরব ঘাতক কিডনি রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। ভেজাল খাবার এড়িয়ে চলা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখলে কিডনি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬