ঈদ ঘিরে সক্রিয় জাল চক্র
ঈদের ব্যস্ততাকে পুঁজি করে প্রতিবছরই সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল টাকা প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী চক্র। ঈদ বাজারে যখন অর্থের লেনদেন বহুগুণ বেড়ে যায়, তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দেয় বিপুল পরিমাণ নকল নোট।
বিশেষ করে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা, গরুর হাট এবং ভিড়ভাট্টা পূর্ণ স্থানগুলোকেই তারা প্রতারণার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়। খুব সুনিপুণভাবে তৈরি করা এসব জাল নোট সাধারণ মানুষের জন্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে অনেক ক্রেতা ও বিক্রেতা অজান্তেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
বর্তমানে এই চক্রগুলো শুধুমাত্র বড় অঙ্কের নোট নয়, বরং ১০০, ২০০ ও ৫০০ টাকার ছোট নোটও বাজারে ছাড়ছে, যাতে সাধারণ মানুষ খুব একটা সতর্ক থাকে না। জাল টাকা ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে তারা নানা কৌশল অবলম্বন করে; যেমন- ব্যস্ততার সুযোগে পণ্য কেনার সময় কৌশলে নকল নোট গছিয়ে দেয়া কিংবা ব্যাংকিং লেনদেনের ভিড়কে ব্যবহার করা।
ঈদ উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই জাল নোটের কবলে পড়ে বিষিয়ে না ওঠে, সেজন্য প্রশাসন কঠোর নজরদারি বাড়ালেও সাধারণ মানুষের সচেতনতাই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। কেনাকাটার সময় প্রতিটি নোট ভালোভাবে যাচাই করা, ইউভি লাইট বা স্পর্শের মাধ্যমে নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা এবং অতিরিক্ত লোভ পরিহার করাই এই চক্রের হাত থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। সচেতনতা ও সতর্কতাই পারে ঈদ আনন্দকে জাল জালিয়াতিমুক্ত রাখতে।
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সামপ্রতিক তদন্ত ও গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জাল নোট তৈরির প্রযুক্তির এক ভয়াবহ ও আধুনিক রূপ সামনে এসেছে। অপরাধীরা এখন আর সনাতন বা সাধারণ মানের ফটোকপি মেশিনের ওপর নির্ভরশীল নয়। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বর্তমানে অত্যন্ত কম খরচে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নিখুঁত ও উন্নতমানের জাল নোট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
আগেযেখানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার ১০০টি নোট (১ লাখ টাকা) তৈরি করতে চক্রের চার থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হতো, এখন আধুনিক গ্রাফিক্স ও বিশেষ কালির সহজলভ্যতার কারণে তা নেমে এসেছে মাত্র আড়াই হাজার টাকায়। ছাপাখানা থেকে তৈরি হওয়ার পর এই জাল নোটগুলো হাতবদল হয়।
বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি এক লাখ টাকার জাল নোট মাত্র ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জাল টাকার চক্রগুলো এখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। ফেসবুক, টেলিগ্রাম বা বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপে সাংকেতিক পোস্ট দিয়ে জাল নোট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। এমনকি আন্তঃজেলা কুরিয়ার সার্ভিস ও অনলাইনভিত্তিক ডেলিভারি ব্যবস্থা ব্যবহার করে গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে জাল টাকার বান্ডিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এবারের ঈদে জাল নোট চক্রের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান সফট টার্গেট হলো কোরবানির পশুর হাট। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও পারিপার্শ্বিক কারণ রয়েছে: দ্রুত লেনদেন ও ভিড়: পশুর হাটে সাধারণত লাখ লাখ টাকার নগদ লেনদেন হয়। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই এক ধরনের তাড়াহুড়ো থাকে। ভিড়ের মধ্যে এবং দ্রুত টাকা গুনে নেয়ার সময় বিক্রেতাদের পক্ষে প্রতিটি নোটের আসল-নকল যাচাই করা সম্ভব হয় না।
সমপ্রতি বড় ধরনের জাল নোটের চালানের সন্ধান পেয়ে রাজধানীর উত্তরা এবং গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় একযোগে সফল চিরুনি অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ।
গত ১৪ মে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে উত্তরার একটি আস্তানা থেকে চক্রের অন্যতম মূল হোতা মুজিবুর রহমানকে আটক করা হয়। পরে তার দেয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার একটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, পুরো একটি ফ্ল্যাটকে জাল নোট তৈরির মিনি কারখানায় রূপান্তর করা হয়েছে। টঙ্গীর সেই কারখানা থেকে নগদ ৩৪ লাখ টাকার সমপরিমাণ জাল নোট এবং নোট তৈরির বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও উন্নতমানের ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এ সময় চক্রের আরও দুই সক্রিয় সদস্য দুলাল ও মামুনকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
ডিবির বক্তব্য: ‘আটককৃত চক্রটি পবিত্র কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ঢাকার গাবতলী, উত্তরা ও আফতাবনগরসহ বড় বড় পশুর হাটে এই ৩৪ লাখ টাকা ছড়িয়ে দেয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিল। সময়মতো অভিযানটি না হলে পশুর হাটে অনেক প্রান্তিক খামারি সর্বস্বান্ত হয়ে যেতেন।’
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা বা গাজীপুর নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চল এবং দেশের বড় বড় জেলা শহরের আবাসিক ভবন, গ্যারেজ ও প্রত্যন্ত এলাকার টিনশেড বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ছাপাখানা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আসল নোটের জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা ও রং পরিবর্তনকারী কালির অবিকল রূপ তৈরি করছে। জাল নোট তৈরিতে ব্যবহূত বিশেষ ধরনের কাগজ, হলোগ্রাম এবং ইউভি কেমিক্যাল সাধারণ বাজার থেকে সংগ্রহ করা কঠিন হওয়ায় কিছু কিছু যন্ত্রাংশ ও রাসায়নিক উপকরণ ভারত, চীন ও দুবাই থেকে সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আনা হচ্ছে। আধুনিক গ্রাফিক্স সফটওয়্যার ব্যবহার করে আসল নোট স্ক্যান ও ডিজাইন সম্পাদনা করার পর হাই-রেজোলিউশন লেজার প্রিন্টারে এগুলো প্রিন্ট করা হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই নোটগুলো এতটাই নিখুঁত হচ্ছে যে, সাধারণ মানের জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনেও তা ধরা পড়ছে না। জাল টাকার বিস্তার রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে যে সমস্ত ব্যাংকিং বুথ পশুর হাটে স্থাপন করা হচ্ছে, খামারি ও ক্রেতাদের উচিত বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে অলসতা না করে সেই বুথগুলো থেকে টাকা পরীক্ষা করে নেয়া। বিশেষ করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট নেয়ার সময় এর নিরাপত্তা সুতা, খসখসে ভাব এবং রং পরিবর্তনকারী কালির দিকে ভালো করে নজর দিতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে যারা জাল টাকার ব্যবসা করছে, তাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, তবেই প্রতারণা থেকে মুক্তির আশা করা যায়।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬