|
প্রিন্টের সময়কালঃ ১৮ মে ২০২৬ ০৭:২৮ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ১৮ মে ২০২৬ ০৩:৩০ অপরাহ্ণ

আগামী অর্থবছরে ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন


আগামী অর্থবছরে ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন


আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচির মূল আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। সব মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।

 

সরকার জানিয়েছে, এবারের উন্নয়ন কর্মসূচি পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনায় পাঁচটি মূল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দুর্বল অর্থনীতির পুনর্গঠন, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিনির্ভর সামাজিক সংহতি জোরদার।

 

রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার অংশে বিচার বিভাগ ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি বহু-বছর মেয়াদি সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

উন্নয়ন কর্মসূচিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খাতভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।

 

এ ছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।

 

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ—৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার পরিমাণ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।

 

এবারের এডিপির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো থোক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্পভিত্তিক সরাসরি বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।

 

কার্যপত্র অনুযায়ী, বিশেষ প্রয়োজনভিত্তিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৭ কোটি টাকা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ৫৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।

 

স্বাস্থ্য খাতে চলমান প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, কিন্তু একই খাতে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগেও থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।

 

সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সামাজিক উন্নয়ন সহায়তার ১৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিবার কার্ড কর্মসূচির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানী হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

 

প্রস্তাবিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১০৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং ৪৩টি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্প রয়েছে।

 

এছাড়া ভবিষ্যতে অনুমোদনের জন্য ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে ২২৩টি প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

এডিপিতে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রম অগ্রাধিকার পেয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলাকে পণ্য পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

তবে বিশাল এ উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন হার ৩৩ শতাংশের সামান্য বেশি এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ব্যবহারের হার প্রায় ৪০ শতাংশ।

 

এই বাস্তবতায় আরও বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

 

সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জুন ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করা সম্ভব এমন প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পে নতুন ব্যয় সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

 

সরকারের আশা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর মাধ্যমে নতুন উন্নয়ন কর্মসূচি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬