|
প্রিন্টের সময়কালঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:২৬ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০১:০৫ অপরাহ্ণ

চোরাই তেলের ভয়াবহ সিন্ডিকেট


চোরাই তেলের ভয়াবহ সিন্ডিকেট


# ২৭ দিনে ৩ লাখ লিটার তেল উদ্ধার

# নদীপথে জাহাজ ও সড়কে ট্যাংক লরি থেকে অহরহ তেল চুরি করা হয়

# ৭২ হাজার লিটার বিমানের তেল চুরি ২০ দিনেও তদন্ত শেষ হয়নি

# পাহারা দেওয়ার পরও তেল চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না : জ্বালানিমন্ত্রী

দেশজুড়ে চোরাই তেলের ভয়াবহ সিন্ডিকেটের তৎপরতরা চলে আসছে বহুদিন ধরে। অনেক শক্তিধর এ সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক বিগত দিনে বহু চেষ্টা করেও কেউ ভাংতে পারেনি কেউ। বরং রুট লেভেলে জড়িয়ে আছে তেল সিন্ডিকেটের কাজ। রাস্তার পাশের খুপরি ঘর থেকে শুরু করে তেলের ট্যাংকলরি, ডিপো তেলবাহী জাহাজ পর্যন্ত বিস্তুৃত এদের নেটওয়ার্ক। পাম্পের বাইরে এমন অনিরাপদভাবে জ্বালানি তেল কেনাবেচা আইনত দন্ডনীয় হলেও নজরদারির অভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই ‘ব্ল্যাক মার্কেটিং’।

সম্প্রতি বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ¦ালানি তেল নিয়ে সংকটের আলোচনার পাশাপাশি চোরাই তেলের সিন্ডিকেটের বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রতিদিনই চলছে চোরাই তেল উদ্ধার অভিযান।তেল চুরির তথ্য দিলে লাখো টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করে মন্ত্রণালয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, পেট্রোল পাম্প ও ডিপো পাহারা দেওয়ার পরও তেল চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রতিদিন পাম্পে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়, তা বিক্রি হতে সাধারণত এক থেকে দেড় দিন সময় লাগার কথা থাকলেও বর্তমানে তা দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত অন্তরবর্তীকালীন সরকারের সময় চোরাই তেল সিন্ডিকেট নিয়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরী করা হয়। সেই প্রতিবেদনের আলোকে কয়েকটা অভিযানও চলে। বিশেষ করে ফতুল্লা যমুনা ডিপো থেকে তেল গায়েব হওয়ার ঘটনা পর বিষয়টি জোরেসোরে আলোচনায় আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নদী পথে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গায় জাহাজ থেকে তেল চুরি নিত্য দিনের। এছাড়া ডিপো থেকে তেল নিয়ে যাওয়ার পথে ট্যাংকলরি থেকে তেল চুরির ঘটনাও অহরহ ঘটছে। মেঘনা নদী ঘিরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় লাইটার জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল চুরির চক্র গড়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে ওই চক্র। ইতিমধ্যে দিনদুপুরে লাইটার জাহাজ থেকে তেল চুরির ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই ভিডিও থেকে ডিজেল চোরাচালান চক্রের অপকর্মের চিত্র উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, সড়কের পাশে ছোট ঝুপড়ি দোকান। দোকানের সামনে রাখা আছে টিনের ড্রাম। তার ওপরে প্লাস্টিকের কাটা জেরিক্যান। ক্রেতারা দেখলেই বুঝে যান দোকানটিতে চোরাই তেল কেনাবেচা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে এ রকম অনেক দোকান দেখা যায়। সড়কের ১২ কিলোমিটারেই রয়েছে চোরাই তেলের এ রকম ১৬টি দোকান।

৭২ হাজার লিটার বিমানের তেল চুরি ২০ দিনেও তদন্ত শেষ হয়নি

নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে গায়েব হয়ে গেছে ৭২ হাজার লিটার উড়োজাহাজের জ্বালানি (জেট ফুয়েল)। চাঞ্চল্যকর এই চুরির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের ২০ দিন পার হলেও এখনো প্রতিবেদন জমা হয়নি। গত ১১ মার্চ তেল চুরির এই ঘটনা ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ মার্চ পদ্মা অয়েলের উপমহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) মো. শফিউল আজমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দুই-এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও ১এপিল পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত চলাকালে এই চুরির ঘটনায় মূল অভিযুক্ত পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জানা গেছে, ১১ মার্চ যে চারটি ট্যাংলরিতে করে কুর্মিটোলা ডিপোতে তেল নেওয়ার কথা ছিল, সিসিটিভি ফুটেজে সেগুলোকে সেখানে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। পরবর্তী সময়ে তদন্ত দল ১৪ ও ১৫ মার্চ সরেজমিন কুর্মিটোলা ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজ এবং তেলের মজুদ পরীক্ষা করে চুরির প্রাথমিক প্রমাণ পায়। ডিপোতে মজুত তেলের পরিমাণেও বড় ধরনের ঘাটতি শনাক্ত করেন কর্মকর্তারা।

তেল চুরির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে কুর্মিটোলা ডিপো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ১৫ মার্চ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ‘থার্ড টার্মিনাল প্রজেক্টে’র ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়।

পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন,তদন্ত দল সরেজমিন পরিদর্শন করে সবকিছু যাচাই করছে। জ্বালানির চাহিদা মেটাতে আমাদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে, তাই প্রতিবেদন দিতে কিছুটা সময় লাগছে। প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল বিপণন সংস্থা পদ্মা ও মেঘনার শুধু গোদনাইলে অবস্থিত দুটি ডিপো থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার তেল চুরি হয়। এক বছরে এই চুরির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় শত কোটি টাকা। এভাবে সারা দেশে অবস্থিত ২৯টি তেলের ডিপো থেকে বছরে চুরি হয় হাজার টাকার তেল।

সরকারের এই ডিপোগুলো থেকে বছরের পর বছর ধরে এই তেল চুরির মচ্ছব চলছে। একটি সংঘবদ্ধ দল এই তেল চুরিতে জড়িত। তারা শুধু তেল চুরিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, অকটেনের সঙ্গে পেট্রল এবং ডিজেলের সঙ্গে সালফার ও সিসা মিশিয়ে অতিরিক্ত অর্থও হাতিয়ে নেয়। বিগত অন্তবর্তীকালীন সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এই তথ্য ওঠে এসেছিল।

যেভাবে চুরি করা হয় তেল

গোদনাইলের পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা ডিজেল-পেট্রল-অকটেন প্রতারণার মাধ্যমে তেল চুরি করে। অর্থাৎ, নির্ধারিত ফিলিং স্টেশন ডিজেল-পেট্রল ক্রয়ের জন্য পে-অর্ডার করলে দুটি ডিপো থেকে নির্ধারিত আইটেমের তেলের পরিবর্তে শুধু বেশি দামের অকটেন লোড করে দেয়। পরে সিস্টেম লস ও তেলের সম্প্রসারণ নীতির অব্যবহার এবং ভেজাল মিশানো ও অন্যান্য কৌশল অবলম্বন করে বিভিন্ন ধরনের তেলের উদ্বৃত্ত ও ঘাটতির হিসাব ঠিকমতো দেখানো হয়। এভাবে তেল চুরির সিন্ডিকেটের সদস্যরা অকটেনের উচ্চ মূল্যের সুবিধা নিয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করছে। চুরির তেল ফিলিং স্টেশনের মালিকদের কাছে বাজারমূল্য থেকে প্রতি লিটার কিছু কমে বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে উভয় ডিপো থেকে অকটেনের সঙ্গে পেট্রল এবং ডিজেলের সঙ্গে সালফার ও সিসা নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশিয়ে সরবরাহ করা হয়।

সিস্টেম লসের অজুহাত

সিস্টেম লসের আন্তর্জাতিক মাপকাঠির অজুহাতেও চুরি করা হয়। সিস্টেম লসের আন্তর্জাতিক মাপকাঠি শতকরা ০.৩০-০.৫০ অনুসরণ করা হলেও সরবরাহ করা তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সিস্টেম লসের পরিমাণও বেশি হয়। এ অজুহাত দেখিয়েও মেঘনা ডিপো থেকেই প্রতিদিনি গড়ে সাড়ে ১৩ লাখ লিটার তেল বিক্রি হয়। সিস্টেম লসের হিসাবে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার ৭৫০ লিটার পর্যন্ত হয়। পদ্মা ডিপোতে প্রতিদিন গড়ে ২৫ দশমিক ৬০ লাখ লিটার তেল বিক্রি হয়।

আর্থিক ক্ষতি

প্রতিবেদনে আর্থিক ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়- শুধু পদ্মার গোদনাইল ডিপোতে অনিয়মের কারণে প্রতিদিন ১৩ হাজার ৫০০ লিটার তেল চুরি হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা। মাসিক হিসাবে তেল চুরি ২ লাখ ৯৭ হাজার লিটার, যার আর্থিক মূল্য ৪ কোটি টাকা।

পদ্মার গোদনাইল ডিপোতে (অকটেন) বিক্রিতে বিগত ১৫ বছরে ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কোটি টাকার তেল চুরি হয়েছে। অকটেনের দামের তারতম্যের কারণে ২০১০ সালে এক বছরেই ক্ষতি হয় প্রায় ২৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে এসে এ পরিমাণ ৪৫ থেকে ৫০ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- সারাদেশে পদ্মার চারটি, মেঘনার ৯টি, যমুনার ১৬টিসহ সর্বমোট ২৯টি তেলের ডিপো রয়েছে। শুধুমাত্র পদ্মা ও মেঘনার গোদনাইল ডিপো থেকে প্রতিদিন ৩০-৩৫ লাখ টাকার তেল চুরি হয়, যার মাসিক মূল্য দাঁড়ায় ৭ কোটি টাকার বেশি। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় শত কোটি টাকা। যদি দেশের অন্যান্য তেল ডিপোগুলোয়ও একই হারে চুরি হয়, তাহলে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার তেল চুরি হয়ে থাকে। ডিপোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বিএসটিআইর কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও এর সাথে জড়িত রয়েছেন বলা হয়েছে।

তেল চুরির ‘মহাপরিকল্পনায়’ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি

যমুনা অয়েল কোম্পানির নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে সোয়া লাখ লিটার ডিজেল উধাও হয়ে যায়। বিপিসির তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও বিপিসি কিংবা যমুনা অয়েল কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি। প্রতিবেদনে ক্যালিব্রেশন কোম্পানির মিথ্যা ক্যালিব্রেশন রিপোর্ট দিয়ে তেল চুরির আগাম চেষ্টা, যমুনা অয়েলের সিবিএ নেতার দৌরাত্ম্য, সিডিপিএল প্রকল্পে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় জটিলতা, কর্মকর্তাদের গাফিলতি চিত্র এসেছে।

সম্প্রতি যমুনা অয়েল ফতুল্লা ডিপো থেকে সোয়া লাখ লিটার তেল গায়েবের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনা তদন্তে গঠিত বিপিসির কমিটি গত ১১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ২৫টি পর্যবেক্ষণ ও ১৩টি সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় দুই মাস সময় পেরিয়ে গেলেও তেল চুরির এ মহাপরিকল্পনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিপিসির তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফতুল্লা ডিপোর গেজার (তেল পরিমাপক) ও সিবিএর কার্যকরী সভাপতি জয়নাল আবেদীন টুটুলের ডিপো নিয়ন্ত্রণের তথ্য। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে, টুটুলকে কেন্দ্র করে ফতুল্লা ডিপোতে একটি চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের মাধ্যমে ফতুল্লা ডিপোর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোহাম্মদ ইকবালকে ইলেকট্রিশিয়ান পদ থেকে গেজার হিসেবে পদায়নে টুটুল সুপারিশ করেন। ডিপোর স্থায়ী, অস্থায়ী ও দৈনিক ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ, পদায়ন ও বদলিতে টুটুল সরাসরি সম্পৃক্ত কিংবা প্রভাব বিস্তার করেন।

কর্ণফুলী নদী হয়ে উঠেছে চুরির রুট

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে দেশি-বিদেশি জাহাজ নিয়মিত পণ্য খালাস করে। সন্ধ্যার পর চোরাই তেল পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই নদী পথ। জাহাজে কর্মরত নাবিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘জরুরি মালামাল পৌঁছে দেওয়ার’ অজুহাতে মাঝিরা নৌকায় করে তেল সংগ্রহ করেন। এই তেল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, স্থানীয় পেট্রোল পাম্প, খোলা বাজার ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান চালকদের কাছে বিক্রি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাইটার জাহাজেও অবৈধভাবে বাংকারিং করা হয়।

জাহাজ থেকে প্রতিদিন হাজার লিটার তেল চুরি

তেলবাহী জাহাজ থেকে প্রতিদিন চুরি হচ্ছে হাজার লিটার ডিজেল, অকটেন। সেখান থেকে বিশেষ উপায়ে পাইপলাইনে ড্রামে ভরার পর ছোট নৌকায় রাতের বেলা এই তেল পৌঁছে যাচ্ছে কালোবাজারে। এই চুরির সঙ্গে জড়িত জাহাজের সারেং, তেল ডিপোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বাস্তবিকই সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী বড়াল নদী রাতের আঁধারে পরিণত হয় চোরাই তেলের বিশাল বাজারে। প্রতি রাতে চুরির কারণে বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সেই টাকায় ফুলেফেঁপে উঠছে একটি অপরাধী চক্র।

প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন জাহাজ ও ট্যাংকার থেকে ৫০ থেকে ৭০ হাজার লিটার তেল চুরি হয়। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫-২০ লাখ লিটার। বছরে ২ থেকে আড়াই কোটি লিটার। লিটারপ্রতি ২ টাকা করে লাভ হলেও চোরাই এই তেলের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রতিদিন ২ কোটি টাকা। মাসে ৬০ কোটি এবং বছরে টাকার অঙ্কে মূল্য দাঁড়ায় ৭০০ কোটি টাকার ওপরে।

কৃত্রিম সংকট তৈরিতে সক্রিয় রাজনৈতিক চক্র

পেট্রোল পাম্প মালিকদের একটা বড় অংশ বিগত সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী। মূলত তারাই কৃত্রিম জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি করে পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে। জ্বালানি সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রিপোর্টে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে ট্যাংক লরিগুলো থেকে তেল চুরি করা হয়। অনেক সময় ডিপোতে তেল লোড করার সময় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিটি লরিতে ১৫০-২০০ লিটার বাড়তি তেল দেওয়া হয়, যা পরে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। এছাড়া ডিপোগুলো থেকে তেল উত্তোলনের পর পাম্প মালিকরা তেলের দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করে রাখেন। বিশেষ করে তেলের দাম বাড়ার গুঞ্জন উঠলে রাজধানীসহ দেশের অনেক পাম্পে হঠাৎ ‘সাপ্লাই নেই’ বলে সংকট তৈরি করা হয়।

পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ডিলারস্ ডিস্ট্রিবিউটারস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, যারা ন্যাশনাল ক্রাইসিসের সময় এ ধরনের গর্হিত কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমার মনে হয় এখানে স্ট্রেট স্যাবোটাজ আছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে।

ক্যাবের জ¦ালানি উপদেস্টা ড. শামসুল আলম বলেন, জাহাজ থেকে ডিপো কিংবা ডিপো থেকে পাম্প ও খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপও নিতে হবে। এক্ষেত্রে যেসব সরকারি কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন, তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি

২৭ দিনে ৩ লাখ লিটার তেল উদ্ধার

দেশব্যাপী অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুতের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে গত ৩ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ ৩১ মার্চ গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জ এ ১৩৯৮০ লিটার ডিজেল উদ্ধার, জরিমানা ও কারাদন্ড প্রদান।

নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলস্থ মেঘনা ডিপোর ঈদগাহর পাশের স্পটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৯১০০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয় এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধ মজুদদার সিফাতকে ছয় হাজার টাকার অর্থদন্ড ও দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় অভিযানে গোদনাইলস্থ মেঘনা ডিপোর পাশের এলাকায় এস এ রোডে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৪৮৮০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। অভিযুক্ত নাসিরকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে তিন হাজার টাকা অর্থদন্ড ও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। এর আগে ৩১ মার্চ দিনে ৩৯১টি অভিযান চালানো হয়েছে। এতে জ্বালানি খাতের অভিযানে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬