ছুটির দিনেও মিলবে বিএসটিআই সেবা, বন্দরে ড্যামারেজ কমাতে শিল্প সচিবের কঠোর নির্দেশনা
দেশের আমদানিকারক ও শিল্পোদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। আমদানিকৃত পণ্যের দ্রুত খালাস নিশ্চিত করতে এবং বন্দরে ব্যবসায়ীদের গুণতে হওয়া বিপুল পরিমাণ ড্যামারেজ বা ক্ষতিপূরণ চার্জ থেকে রক্ষা পেতে এখন থেকে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও খোলা থাকবে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই-এর সংশ্লিষ্ট সেবা বিভাগ।
শনিবার তেজগাঁওস্থ বিএসটিআই প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প সচিব মো. ওবায়দুল রহমান এই বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতির সঞ্চার হবে এবং সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পর বিএসটিআই-এর ছাড়পত্র পেতে অনেক সময় কয়েক দিন লেগে যায়। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বিএসটিআই-এর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পণ্য খালাস প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। এতে বন্দরে জাহাজের অবস্থান দীর্ঘায়িত হয় এবং আমদানিকারকদের প্রতিদিন হাজার হাজার ডলার ড্যামারেজ দিতে হয়।
ব্যবসায়ীদের এই যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে শিল্প সচিব বলেন, ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আমদানিকৃত পণ্যের দ্রুত ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে বিএসটিআই কর্মকর্তাদের এখন থেকে ছুটির দিনেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। বন্দর থেকে পণ্য খালাসে ড্যামারেজ কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা চাই না বিএসটিআই-এর সার্টিফিকেশনের জন্য কোনো পণ্য বন্দরে একদিনের জন্যও আটকে থাকুক।
গণশুনানিতে সচিব বিএসটিআই-এর সেবার মান আরও উন্নত করার তাগিদ দেন। তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, বিএসটিআই-এর সিটিজেন চার্টারে যে সময়সীমা নির্ধারিত আছে, আমদানিকৃত পণ্যের ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে তার চেয়েও কম সময় নিতে হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের আগেই যেন ব্যবসায়ীরা তাদের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র হাতে পান তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, সরকার নিজে ব্যবসা করে না বরং ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়। ব্যবসায়ীরা দেশের উন্নয়নের প্রধান কারিগর। তাদের যেকোনো ন্যায়সঙ্গত সমস্যায় সরকার অভিভাবকের মতো পাশে থাকবে।
বিএসটিআই-এর মহাপরিচালক এম এ কামাল বিল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রাণ আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, সিটি গ্রুপ, ওয়ালটন, এসিআই লিমিটেড, পোলার আইসক্রিম, অলিম্পিক বেকারি অ্যান্ড কনফেকশনারি লিমিটেড, অলিম্পিয়া বেকারি, ট্রাস্ট ইনফিনিটি ফার্মস ও পিয়ারলেস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ব্যবসায়ীরা বিএসটিআই-এর ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো এবং অনলাইন সার্টিফিকেশন সিস্টেম আরও সহজ করার দাবি জানান।
গণশুনানিতে নকল পণ্য ও অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। সচিব বলেন, বৈধ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিতে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে বাজারে নকল পণ্যের উৎস শনাক্ত করতে হবে। যারা অবৈধভাবে বিএসটিআই-এর লোগো ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করছে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি উৎস থেকে তাদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন তিনি। বিশেষ করে বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা লাইভ বেকারিগুলোতে অভিযান জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন যে, কোনো নতুন পণ্যের মান প্রণয়ন বা পরিবর্তনের পর এসআরও বা স্ট্যাটিউটরি রুলস অ্যান্ড অর্ডারস প্রকাশ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে নতুন পণ্য বাজারে ছাড়তে বা আমদানিতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
এর প্রেক্ষিতে বিএসটিআই মহাপরিচালক এম এ কামাল বিল্লাহ আশ্বস্ত করেন যে, এসআরও প্রকাশের সময়সীমা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হবে। এছাড়া সুগার এবং নন সুগার রুটি ও পাউরুটির স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ডকে একত্রিত করার যৌক্তিক প্রস্তাবটিও গ্রহণ করা হয়।
খাদ্যদ্রব্যে ফুড গ্রেড কালার ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান খাদ্য রং ব্যবহারের আগে প্রয়োজনে বিএসটিআই ল্যাবরেটরি থেকে তা পরীক্ষা করে নিতে পারবে যাতে ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়। বিএসটিআই মহাপরিচালক বলেন, আপনারা আমাদের সেবাগ্রহীতা এবং দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
আপনাদের সেবায় কোনো ঘাটতি বা অবহেলা থাকলে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ জবাবদিহি করতে বাধ্য। আজকের গণশুনানিটি ছিল মূলত বিএসটিআই এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ সেতুবন্ধন। শিল্প সচিবের এই সময়োপযোগী নির্দেশনা এবং বিএসটিআই কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক অবস্থান বাংলাদেশের শিল্পায়নের পথকে আরও মসৃণ করবে। ছুটির দিনে সেবা প্রদানের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আমদানিকারকদের খরচ কমিয়ে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতেও সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬