আলোচনায় জুলাই সনদ
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় প্রথম দিন বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ১৪ সংসদ সদস্য (এমপি) বক্তব্য দিয়েছেন। আলোচনায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিএনপির সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়া নিয়ে সমালোচনা ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়েই আপত্তি তোলা হয়। বিএনপির সদস্যরা অবশ্য অতীত স্মৃতি, স্থানীয় উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি জানান।
গতকাল রোববারের বৈঠকে প্রথমে চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব তোলেন। হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু তাতে সমর্থন করেন। এরপর আলোচনা শুরু হলে প্রথমে কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপিদলীয় এমপি মনিরুল হক চৌধুরী বক্তব্য দেন। দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শেষে সংসদ ১৩ দিনের বিরতি দিয়ে আগামী ২৯ মার্চ বিকেল ৩টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
মনিরুল হক চৌধুরী শুরুতেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে অভিনন্দন জানান এবং তাঁর ছাত্রজীবন, খেলোয়াড়ি জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার স্মৃতিচারণ করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তা জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগের ফল বলে মনে করেন তিনি। মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াই এক বিষয়, কিন্তু জামায়াত প্রতিপক্ষ হলে কী হয়– এবার তা মাঠে বোঝা গেছে। একই সঙ্গে জামায়াতকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সময়কার সমঝোতা রাজনীতি এবং বিএনপির ভূমিকা যেন তারা ভুলে না যায়।
সরকারদলীয় হুইপ জি কে গউছ বলেন, সিলেট বিভাগের মানুষের যাতায়াত দুর্ভোগ অনেক পুরোনো। তিনি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং রেলসেবার মান উন্নয়নের দাবি জানান। তিনি হবিগঞ্জে মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৃন্দাবন সরকারি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও বলেন।
পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াতের সদস্য মাসুদ সাঈদী বলেন, পঁচিশ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় এলেও বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে মানুষের প্রত্যাশায় আঘাত করেছে।
সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা টেনে পাবনা-১ আসনের জামায়াতের এমপি মো. নাজিবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ আইনের মর্যাদা পায়, ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়ের অভাবের যুক্তি টেকসই নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে পথ বের করা সম্ভব।
বরগুনা-১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের এমপি মো. অলিউল্লাহ বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের অংশ থাকা একজন রাষ্ট্রপতির এ সংসদে ভাষণ দেওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অপমান করার শামিল। তবে একই সঙ্গে তিনি ভাষণকে ‘সুলিখিত’ ও ‘সাবলীল’ বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রপতির ভাষণে জুলাই ঘোষণা, জুলাই সনদ এবং সেই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নটি যথেষ্টভাবে আসেনি। সংস্কার কমিশনের কথা থাকলেও সংস্কারের রাজনৈতিক ভিত্তির কথা ভাষণে অনুপস্থিত।
গোপালগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির এমপি সেলিমুজ্জামান মোল্লা বলেন, গোপালগঞ্জকে আলাদা রাজনৈতিক প্রতীকের জেলা হিসেবে না দেখে সাধারণ উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যেই বিবেচনা করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
ফেনী-১ আসনের বিএনপির এমপি মুন্সী রফিকুল আলম বলেন, খালেদা জিয়ার নির্বাচনী এলাকা হওয়ার কারণে ১৬ বছর ফেনী উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফেনীতে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক উন্নয়নের দাবি জানাচ্ছি।
নাটোর-৩ আসনের বিএনপির এমপি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন বিএনপি দেখিয়েছে, তা বাস্তবায়নে আঞ্চলিক সম্ভাবনাগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চলনবিল এলাকার কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণে অতীত শাসনের সমালোচনা আসায় সন্তোষও প্রকাশ করছি।
চট্টগ্রাম-১ আসনের বিএনপির এমপি নুরুল আমিন বলেন, আমার এলাকায় দীর্ঘদিন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। খালকাটা কর্মসূচি দক্ষিণাঞ্চলের মতো অন্য এলাকাতেও প্রভাব ফেলবে।
পিরোজপুর-৩ আসনের বিএনপির এমপি রুহুল আমিন দুলাল বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণে জুলাইযোদ্ধাদের কথা এসেছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অপকর্মও উঠে এসেছে। এ কারণে ভাষণের ইতিবাচক দিকও আছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির এমপি জালালউদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে অতীত শাসনের অনাচার তুলে ধরে কার্যত ‘রাজসাক্ষী’ হয়েছেন। তাঁর ভাষ্যে, রাষ্ট্রপতির লিখিত ভাষণে ফ্যাসিবাদী শাসনের জুলুম-নির্যাতনের কথা এসেছে, সে জন্য ভাষণের ওই অংশকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়।
নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতের এমপি আবদুল মুন্তাকিম নিজেকে জুলাইযোদ্ধা ও জুলাই কারাবন্দি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা ছিল ন্যায্যতা, সমান অধিকার এবং সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ গড়া।
ময়মনসিংহ-১০ আসনের বিএনপিদলীয় সদস্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ৫ আগস্টের রাজপথ থেকে সংসদ কক্ষে আসার অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বিরোধী ও সরকারি উভয়পক্ষকে আহ্বান জানান, ‘বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা’ না করে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের বিএনপিদলীয় সদস্য এবিএম মোশারফ হোসেন বলেন, বিএনপিকে দুর্নীতির দায়ে কলঙ্কিত করার যে প্রচার ছিল, রাষ্ট্রপতির ভাষণের বাস্তব চিত্র তা খণ্ডন করেছে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬