জীবনের পরম তৃপ্তি ও এক অদ্ভুত বাস্তবতা: নাজমুল হাসান সরকার সহকারী সচিব
ডেস্ক নিউজ, ঢাকা প্রেস:
মানবিকতার আলোকবর্তিকা: মরিয়মি খাতুনের চোখে দেখা জীবনের গল্প....
মানুষের অভাব বা দুঃখ-কষ্টের ব্যাপ্তি কতটা গভীর হতে পারে, তা দূর থেকে অনুধাবন করা কঠিন। নোয়াখালীর এক নিভৃত পল্লীতে ৭২ বছরের বৃদ্ধা মরিয়মি খাতুনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে ভাবনাই নতুন করে দোলা দিল মনে। জীবনের সমস্ত অনুযোগ আর ক্ষোভ যেন এক নিমেষেই ধুয়ে-মুছে গেল তাঁর করুণ চাহনির সামনে। অনুভূতির গভীরে উপলব্ধি হলো—স্রষ্টা আমাদের কতটা শান্তিতে ও সুখে রেখেছেন।
মরিয়মি খাতুনের জীবনসংগ্রাম কোনো সাধারণ গল্পের মতো নয়; এটি এক ট্র্যাজিক জীবনকাব্য। প্রায় তিন দশক আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। একমাত্র সম্বল ও আশার আলো যে মেয়েটি ছিল, তিন বছর আগে ক্যানসার নামের মরণব্যাধি কেড়ে নিয়েছে তাকেও। রেখে গেছে এক কিশোর সন্তানকে। জীবনের নির্মম তাগিদে সেই নাতিটি আজ ঢাকায় একটি প্রসাধন সামগ্রীর দোকানে কাজ করে জীবিকা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এক চিলতে ঘর আর নিশ্চুপ চাহনি
বয়সের ভার ও দূরারোগ্য শারীরিক অসুস্থতায় জরাজীর্ণ মরিয়মি খাতুন আজ ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না, কথা বলাও তাঁর জন্য এক দুঃসাধ্য লড়াই। একটি ভঙ্গুর, ছোট ঘরই তাঁর একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই। প্রতিবেশীদের দেওয়া টুকটাক খাবারে কোনোমতে টিকে আছে তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস।
মাঠে কাজ করার ফাঁকে তাঁর মুখোমুখি হয়ে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “সরকারের কাছে কি আপনার কোনো কিছু চাওয়ার বা বলার আছে?”
তিনি কোনো উত্তর দেননি। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেই নিষ্পাপ, আকুল চাহনিতে ফুটে উঠেছিল এক গভীর অসহায়ত্ব—যা কোনো ভাষার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি অর্থবহ।
“তার চাহনিতে অসহায়ত্বের নীরব প্রকাশ—আমাদের কারোই বোঝার বাকি ছিল না যে, এই নীরবতা হাজারো আকুতির চেয়েও করুণ।
প্রাশাসনিক উদ্যোগ ও মানবিক প্রতিশ্রুতি
বিসিএস সাধারণ প্রশাসনের চার মাসব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণ কোর্সের (Foundation Training Course) অংশ হিসেবে নোয়াখালী জেলায় সংযুক্তি চলাকালে এমন আরও একটি পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তবে মরিয়মি খাতুনের জীবনগল্প বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একলহমে বদলে দিয়েছে।
শুধু চোখের জল ফেলে দায় শেষ করা হয়নি। প্রশিক্ষণার্থী দলটির পক্ষ থেকে নোয়াখালী জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে পরিবার দুটির সার্বিক চিত্র তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও অনুদানের ব্যবস্থা করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
শিক্ষার নতুন দিগন্ত
চার মাসের এই দীর্ঘ প্রশিক্ষণ কোর্সের অর্ধেক পথ পেরিয়ে এসে অর্জিত হয়েছে অনেক তাত্বিক জ্ঞান। তবে বিসিএস কর্মকর্তাদের মতে, তাঁদের অর্জিত সবচেয়ে বড় এবং হৃদয়ছোঁয়া শিক্ষাটি এসেছে এই মরিয়মি খাতুনের আঙিনা থেকেই।
যদি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে নোয়াখালীর এই সংযুক্তি এবং সংক্ষিপ্ত সফরই হবে জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি ও সফল মানবিক উদ্যোগ।
তথ্যসূত্র: নাজমুল হাসান সরকার
-
সহকারী সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক) | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০২, লেভেল #০২, মাহতাব সেন্টার , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ১৭৭ , বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬