সৃজনশীল অর্থনীতিকে জিডিপির ২-৩ শতাংশে নিতে চায় সরকার: অর্থমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্যোগে ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিল’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীল খাতের অবদান ১০ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ এখনই সেই পর্যায়ে যেতে না পারলেও এ খাতকে জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশে নেওয়া সম্ভব হলে বিপুল জনগোষ্ঠী এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এ খাতে কাজের বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের খাবার, সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, অনলাইনভিত্তিক কাজ এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সৃজনশীল পণ্যে রূপ দিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নেওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রাম-গঞ্জের গান, খাবার ও স্থানীয় সংস্কৃতির অনেক কিছু এখনো বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। যথাযথ সহায়তা পেলে এসব সম্পদকে বাজারযোগ্য পণ্যে পরিণত করা যেতে পারে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের একজন সাধারণ মানুষের তৈরি একটি গান জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেটিই বড় অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সেই সৃজনশীলতা রয়েছে, প্রয়োজন শুধু সেটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, এ খাতে যুক্ত তরুণদের সৃজনশীলতাকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশটির বিভিন্ন গ্রামের মানুষ নিজেদের বাড়িতে পণ্য তৈরি করেন। সরকারি সহায়তায় কাঁচামাল, দক্ষতা, নকশা ও ব্র্যান্ডিংয়ের উন্নয়ন ঘটিয়ে এসব পণ্য বিশ্ববাজারে বিক্রির উপযোগী করা হয়েছে। এমনকি পণ্য সংগ্রহ করে সরাসরি বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাংলাদেশেও এ ধরনের সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, গ্রামের তৈরি পণ্যকে যথাযথভাবে প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিং করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু ঋণ বিতরণ করলেই হবে না। ঋণগ্রহীতার পণ্য ও ব্যবসাকে উন্নত করতে দক্ষতা, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন সহায়তাও দিতে হবে। উদ্যোক্তাকে শুধু ঋণগ্রহীতা হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে ব্যাপক সৃজনশীলতা রয়েছে। কিন্তু আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে অনেকেই নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেন না। আবার অনেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকেন বা ব্যাংকে যেতে সংকোচবোধ করেন। তাই উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বা ‘অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স’ নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থমন্ত্রী জানান, কর্মসংস্থান ব্যাংকের কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আরও ৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হলে মোট ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হতে পারে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বড় শিল্প ও বড় প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতিতে সরকারের সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের শুধু অর্থায়ন নয়, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি সাধারণ পণ্যের মূল্য কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক বাজারে উপযোগী পণ্য তৈরি করা গেলে অ্যামাজন, আলিবাবাসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাজারজাত করা সম্ভব।
সংগীত, সংস্কৃতি, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও ওটিটি খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব সৃজনশীল পণ্যের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। বিশ্বের মানুষ বিভিন্ন দেশের গান, সংস্কৃতি ও বিনোদন উপভোগ করছে। তাই বাংলাদেশের শিল্পী ও সৃজনশীল কর্মীদেরও অর্থায়ন ও অন্যান্য সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতি কোনো দাতব্য কার্যক্রম নয়; এর অর্থনৈতিক রিটার্ন থাকতে হবে। অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা এনপিএল কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে ব্যাংকটির এনপিএল প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি তা ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন তহবিলের পাইলট প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি সফল হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কর্মসংস্থান ব্যাংকের রয়েছে। জামানত ছাড়াই এসব জনগোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার জানান, প্রকল্পের আওতায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণে যেখানে সুদের হার অনেক বেশি, সেখানে এই উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে এ উদ্যোগ সরাসরি সম্পৃক্ত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে তিনটি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. এ এফ এম মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ২ শতাংশ সুদে তহবিল সরবরাহ করে, তাহলে কর্মসংস্থান ব্যাংক আরও কম সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে। বর্তমানে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক) | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬