|
প্রিন্টের সময়কালঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৩৮ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:০০ অপরাহ্ণ

বজ্রপাতের মতো হঠাৎ এসেছে হাম, আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না


বজ্রপাতের মতো হঠাৎ এসেছে হাম, আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না


স্বাস্থ্য খাতে এক আকস্মিক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ করেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাম। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের যথাযথ প্রস্তুতির অভাব ছিল বলে প্রকাশ্যেই স্বীকার করে নিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। 

বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ জাতীয় শিশু হাসপাতালে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমের সামনে এ মন্তব্য করেন।

হামের এই আকস্মিক সংক্রমণকে 'বজ্রপাতের' সাথে তুলনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগটি এমন দ্রুততায় ছড়িয়েছে যা কল্পনা করা কঠিন ছিল। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, এই ধরনের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্ব কোনো বিশেষ প্রস্তুতি ছিল না। বিশেষ করে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের অকাল মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও মর্মবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এতগুলো শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি এবং দ্রুততম সময়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে বদ্ধপরিকর।

বিরাজমান সংকট মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) এর সহায়তায় প্রয়োজনীয় টিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী ৫ এপ্রিল, ২০২৬ (রোববার) থেকে দেশব্যাপী এক বিশেষ টিকাদান অভিযান শুরু হবে।

এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো ৬ মাস থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়সী সকল শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার সারাদেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের সমস্ত ছুটি বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে, যাতে টিকাদান কর্মসূচি নিরবচ্ছিন্নভাবে সফল করা যায়।

যদিও রোববার থেকে বিশেষ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে, তবে টিকার পর্যাপ্ত মজুদ নিয়ে কিছুটা শঙ্কার অবকাশ রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ইউনিসেফের দেওয়া টিকা দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও, বড় পরিসরে হামের টিকা সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এই টিকা হাতে পৌঁছাতে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। 

গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১০ জন রোগী, যার মধ্যে ৫ জনই সরাসরি হামে আক্রান্ত। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ রোগীর চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামলানোর জন্য বর্তমান জনবল পর্যাপ্ত নয়। জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার, নার্স এবং কারিগরি জনবল বৃদ্ধি করা না হলে সেবা দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবি ও প্রশাসনিক আশ্বাস

হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেবল রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়েই কথা বলেননি, বরং স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যার বিষয়েও আলোকপাত করেছেন। বিশেষ করে পোর্টারদের বেতন কাঠামো এবং স্বাস্থ্য সহকারী ও সহকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের বিভিন্ন পেশাগত দাবি দাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

মন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, "আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের সমস্যার বিষয়ে অবগত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিনিধিদের সাথে বসে দাবিগুলো পর্যালোচনা করা হবে এবং একটি সম্মানজনক সমাধান সূত্র বের করা হবে।" তিনি মনে করেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সন্তুষ্ট না রেখে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। রোববারের এই টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুকে টিকা দিতে হবে। শিশুর শরীরে জ্বর ও লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে সাথে সাথে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করে সময়সূচী জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতি এবং জনস্বাস্থ্যের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের স্বীকারোক্তি যেমন স্বচ্ছতা প্রকাশ করে, তেমনি প্রস্তুতির ঘাটতি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তবে ইউনিসেফের সহায়তা এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই 'ক্র্যাশ প্রোগ্রাম' দেশের শিশুদের সুরক্ষায় কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬