সীতাকুণ্ডে জাতীয় যুব দিবস উদযাপন, শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক ও উদ্যোক্তাদের সম্মাননা প্রদান
কাইয়ুম চৌধুরী, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি:
‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নানা আয়োজনে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, কেক কাটা, আলোচনা সভা এবং সফল যুব উদ্যোক্তা, সংগঠক, আত্মকর্মী ও যুব সংগঠনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
রোববার (১ নভেম্বর) সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে উপজেলা অডিটরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে র্যালি ও কেক কাটার মাধ্যমে দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. মোরসালিন, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সরোয়ার হোসাইন লাভলু এবং সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম চৌধুরী।
এ ছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন তপন কান্তি বর্মন, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী প্রণবেশ মহাজন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সোনিয়া আক্তার, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মঞ্জুমান আরা বেগম এবং মহসিন ফাতেমা যুব কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা মোহাম্মদ লিটনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি যুবসমাজ। তরুণদের শুধু চাকরির প্রত্যাশী না হয়ে নিজেদের দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। সরকার প্রশিক্ষণ, ঋণ ও বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেকারত্ব দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যুবকদের মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. মোরসালিন বলেন, যুবসমাজই দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। দেশ ও জাতির কল্যাণে তরুণদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুবকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সরোয়ার হোসাইন লাভলু বলেন, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে দক্ষ যুবসমাজের বিকল্প নেই। শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের আইন সম্পর্কে সচেতন, নৈতিকতাসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। মাদক, সাইবার অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে যুবসমাজকে রক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল্লাহ আল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে যুবসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণদের সাফল্য, সম্ভাবনা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ গণমাধ্যমে তুলে ধরা জরুরি। পাশাপাশি মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রেখে শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা তামাজ্জল হোসেন বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও ঋণ কার্যক্রম কাজে লাগিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। সীতাকুণ্ডের যুবসমাজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও যুব সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এক বছরে ৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার যুব ঋণ বিতরণ
অনুষ্ঠানে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের গত এক বছরের কার্যক্রম ও অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুবসমাজকে দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল জনশক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ঋণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান এবং যুব সংগঠন বিকাশে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজস্ব খাত থেকে ক্রমপুঞ্জিত মোট ৫ কোটি ৮৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা যুব ঋণ হিসেবে ১ হাজার ৪৬৬ জনের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ঋণ আদায় হয়েছে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৬২ হাজার ২৬৬ টাকা। ঋণ আদায়ের হার ৯৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫৮৮ জনের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং ৮৫ জন উদ্যোক্তা ঋণ সুবিধা পেয়েছেন।
অন্যদিকে, প্রকল্প খাতে ২১ জনের মধ্যে ৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা যুব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এ খাতে ঋণ আদায়ের হার শতভাগ এবং ১১৭ জনের আত্মকর্মসংস্থানের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রাজস্ব খাতে ৭ হাজার ২০৩ জন, প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ২৬৬ জন, বেসিক প্রশিক্ষণে ১২০ জন এবং কম্পিউটার বেসিক ও নেটওয়ার্কিং বিষয়ে ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নেটওয়ার্কিং প্রশিক্ষণে ২ হাজার ৮২১ জন এবং মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক প্রশিক্ষণে ২০১ জন অংশগ্রহণ করেছেন।
যুবসমাজকে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন কর্মশালা ও জনসচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় EARN Project-এর আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। বর্তমানে সীতাকুণ্ডে নিবন্ধিত যুব সংগঠনের সংখ্যা ৪৯টি।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, যুব উদ্যোক্তা, আত্মকর্মী ও সংগঠনকে উৎসাহিত করতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন যুব উদ্যোক্তাকে মোট ৫ লাখ টাকা, একজন আত্মকর্মীকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং যুব কল্যাণ তহবিল থেকে আদর্শ ছাত্র ও যুব সমাজকে ৭৫ হাজার টাকার অনুদানের চেক প্রদান করা হয়েছে।
বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠদের সম্মাননা
জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সফল যুব সংগঠন ও ব্যক্তিদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়।
শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান: দিশারী যুব ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মহসিন ফাতেমা সিদ্দিকী যুব কল্যাণ ফাউন্ডেশন, আদর্শ ছাত্র ও যুব সমাজ এবং অঙ্গীকার যুব ফাউন্ডেশন।
শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা: জান্নাতুল ফেরদৌস (মিনু), সালমা সুলতানা লাইছু, ফরিদা ইয়াছমিন ও ইব্রাহিম খলিল।
শ্রেষ্ঠ সংগঠক: সরোয়ার উদ্দিন আনসারী, কাউছার আহমেদ সরোয়ারী, মোহাম্মদ রেহান উদ্দিন ও লায়ন মো. নুর খান।
শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মী: সারজিনা আক্তার, মো. মুক্তার হোসেন সাইমন ও মো. ইলিয়াছ সানি।
শ্রেষ্ঠ মানবিক: আবু তাহের।
শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক হিসেবে সম্মাননা পাওয়া সরোয়ার উদ্দিন আনসারী তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, যুবসমাজকে শুধু নিজেদের কর্মসংস্থান নিয়ে ভাবলে চলবে না; সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। একজন যুব সংগঠকের প্রকৃত সার্থকতা তখনই আসে, যখন তাঁর উদ্যোগে অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষ উপকৃত হন।
বিশেষভাবে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে দিশারী যুব ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের স্বীকৃতি সংগঠনটির সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ যুবসমাজ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া গেলে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে যুবকদের দক্ষতা অর্জন, উদ্যোক্তা হওয়া এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে হবে।
তাঁরা আরও বলেন, মাদক, বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। যুবসমাজের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক) | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০২, লেভেল #০২, মাহতাব সেন্টার , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ১৭৭ , বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬