|
প্রিন্টের সময়কালঃ ০৩ জুন ২০২৬ ০১:১৯ পূর্বাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ০২ জুন ২০২৬ ০২:৪০ অপরাহ্ণ

ভিতরে গিয়ে মেয়ের খণ্ডিত মরদেহ দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই


ভিতরে গিয়ে মেয়ের খণ্ডিত মরদেহ দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই


রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার মামলায় আদালতে চোখের জলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার মা পারভিনা আক্তার। ঘটনার দিন প্রতিবেশীর বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য মায়ের সেই আকুল আকুতি আর ভেতরে দেখা লোমহর্ষক দৃশ্যের বিবরণ দিতে গিয়ে এজলাসেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

 

মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর শিশু বা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।

 

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পারভিনা আক্তার বলেন, ঘটনার সময় তিনি রান্না করছিলেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাইসাকে সকাল ১০টার দিকে পাশের ফ্ল্যাটে চাচার বাসায় যাওয়ার কথা বলেন। তখন ছোট মেয়ে রামিসাও সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরলে তিনি তাকে বারণ করেন। রান্নাঘর থেকেই তিনি শুনতে পান বড় মেয়ে রামিসাকে রুমে থাকতে বলছে।

 

এর কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে একটি শিশুর আর্তচিৎকার শুনতে পান পারভিনা। পাশের ফ্ল্যাটের আসামি সোহেল ও স্বপ্নার কোনো সন্তান না থাকায় বিষয়টি তার খটকা লাগে। বাইরে এসে কাউকে না দেখলেও মিনিট চারেক পর বড় মেয়ে রাইসাকে একা ফিরে আসতে দেখে রামিসার কথা জিজ্ঞেস করেন। রাইসা জানায়, রামিসা তার সঙ্গে যায়নি, হয়তো নিচে গেছে। এরপর পুরো ভবনের নিচে, অফিস ও ব্যাচেলরদের ফ্ল্যাটে খুঁজেও রামিসার সন্ধান মেলেনি।

 

তৃতীয় তলায় সোহেলদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখে পারভিনার সন্দেহ তীব্র হয়। তিনি বলেন, “তখন মনে হলো একটু আগে যে বাচ্চার চিৎকার শুনেছিলাম, ওটা কি আমার মেয়ের ছিল? আমার রামিসাকে কি ওরা আটকে রেখেছে?”

 

পারভিনা আক্তার জানান, জুতা দেখে তিনি বারবার দরজা ধাক্কালেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ দেওয়া হয়নি। পরে পাঁচতলার বাসিন্দা মনির ও আসমাসহ অন্য প্রতিবেশীরা জড়ো হন। পারভিনার ফোনে তার স্বামীও অফিস থেকে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে চলে আসেন। সবাই মিলে দরজার গোল্ড লক ভাঙার পর তৈরি হওয়া ছিদ্র দিয়ে দেখা যায় বাথরুম খোলা এবং ভেতরে রক্ত লেগে আছে। স্থানীয় এক তরুণ ঘটনার ভিডিও করা শুরু করেন।

 

উদ্বিগ্ন মা বাইরে থেকেই অভিযুক্ত স্বপ্নাকে ঘরের ভেতর হাঁটতে দেখে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করতে থাকেন, “বুইন দরজাটা খুল, দরজাটা খুল। আমি তোকে কিচ্ছু বলবো না।” কিন্তু স্বপ্নার মন গলেনি।

 

পরবর্তীতে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে যান সবাই। পারভিনা আক্তার বলেন, “ভেতরে ঢুকে দেখি আমার মেয়ের মাথা ও দেহ বিচ্ছিন্ন। মাথা বাথরুমের বালতিতে আর খণ্ডিত দেহটি আসামিদের ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই দৃশ্য দেখার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।” পরে পুলিশ এসে মরদেহ ও অন্যান্য আলামত উদ্ধার করে।

 

সাক্ষ্যগ্রহণের একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু জানতে চান, দরজা ভাঙার পর স্বপ্নার কাছে কিছু জানতে পেরেছিলেন কি না। জবাবে পারভিনা বলেন, তখন অনেক মানুষ ঘরে ঢুকে পড়ায় তিনি নিজে কথা বলতে পারেননি, তবে অন্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করছিল।

 

পিপি আসামির দিকে ইশারা করে জানতে চান, অভিযুক্ত স্বপ্না আদালতে উপস্থিত আছেন কি না। তখন পারভিনা আক্তার কাঠগড়ার দিকে হাত উঁচিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, ওই যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। আমি কতো বলেছি, বইন দরজাটা খুল, দরজাটা খুল। কিন্তু খুলে নাই সে।” এ কথা বলেই তিনি আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।

 

মঙ্গলবার সকাল ১১টা ৩ মিনিটে শুরু হয়ে ১১টা ২২ মিনিটে পারভিনা আক্তারের প্রধান সাক্ষ্য শেষ হয়। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ তাকে জেরা করেন, যা ১১টা ২৬ মিনিটে শেষ হয়। এর আগে এদিন সকালে মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে রামিসার বাবার সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়। শুনানির সময় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাঠগড়ায় হাজির রাখা হয়েছিল।

 

গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের পর প্রযুক্তির সহায়তায় প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সোহেল নিজের অপরাধ স্বীকার করে।

 

তদন্ত শেষে জমা দেওয়া চার্জশিট অনুযায়ী, সোহেল রানা তীব্র মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার দিন সে রামিসাকে জোরপূর্বক বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটি চিৎকার করে পরিবারের কাছে বলে দেওয়ার কথা জানালে ক্ষিপ্ত হয়ে সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। আর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর লাশ গুমের চেষ্টা ও সোহেলকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬