শুল্ক-করমুক্ত বাজেটের দাবিতে এনবিআরে নোয়াব
তথ্যপ্রযুক্তির জয়জয়কার আর ডিজিটাল মাধ্যমের ভিড়ে এমনিতেই কোণঠাসা ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্রশিল্প। তার ওপর বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম এই শিল্পকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সংবাদপত্রশিল্পকে বাঁচাতে একগুচ্ছ দাবি পেশ করেছে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে আয়োজিত এক প্রাক্-বাজেট আলোচনা সভায় নোয়াব নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন বর্তমান কর কাঠামো ও শুল্ক নীতি অব্যাহত থাকলে দেশে স্বাধীন ও মানসম্মত সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
একটি সংবাদপত্রের প্রাণ হলো নিউজপ্রিন্ট বা কাগজ। নোয়াব জানিয়েছে, গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে নিউজপ্রিন্টের দাম টনপ্রতি ৫৬০ ডলার থেকে বেড়ে ৬৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর বর্তমানে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে নিউজপ্রিন্টের ওপর কার্যকর করের বোঝা দাঁড়ায় ১৩০ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত।
নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সভায় বলেন, কাগজের দাম বাড়ছে, ডলারের দাম চড়া, তার ওপর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এই ত্রিমুখী চাপে সংবাদপত্র প্রকাশ চালিয়ে যাওয়া এখন হিমালয় জয়ের মতো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সংকট উত্তরণে নিউজপ্রিন্টের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান তিনি।
বর্তমানে সংবাদপত্রশিল্পকে সাড়ে ২৭ শতাংশ হারে করপোরেট কর দিতে হয়, যা একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সমান। অথচ এই শিল্পটি মূলত জনসেবামূলক এবং বর্তমানে চরম লোকসানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নোয়াবের পক্ষ থেকে এই কর হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সভায় এই বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের তৈরি পোশাকশিল্প যেখানে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করপোরেট কর সুবিধা পায়, সেখানে সংবাদপত্রের মতো একটি লোকসানি শিল্পকে কেন সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে? গত ১৫-১৬ বছর আমরা চরম নিগৃহীত ছিলাম। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক কপি পত্রিকা ছাপাতে যেখানে ২৮ টাকা খরচ হয়, সেখানে পাঠক ও বিজ্ঞাপন উভয়ই কমছে। সরকার সব শিল্পকে সাহায্য করলে সংবাদপত্র কেন বঞ্চিত থাকবে?"
সংবাদপত্রগুলো বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর এবং কাঁচামাল আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম কর দেয়। নোয়াব বলছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের ১০ শতাংশ লভ্যাংশই থাকে না। ফলে এই ১০ শতাংশ কর বছর শেষে সমন্বয় করা সম্ভব হয় না এবং সরকারের কাছে তা পাওনা হিসেবে আটকে থাকে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র নগদ অর্থের সংকট বা 'লিকুইডিটি ক্রাইসিস' তৈরি হচ্ছে। এই কর হার কমানো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে প্রচলিত আয়কর আইন অনুযায়ী, কর্মীর আয়ের ওপর কর কর্মী নিজেই পরিশোধ করেন। কিন্তু সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী, সংবাদকর্মীদের আয়কর প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। নোয়াব এই নিয়মকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে বলেছে, দেশে এমন আইন থাকা উচিত নয় যা সবার জন্য সমান নয়। কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানের এই দায়মুক্তির দাবিটি দীর্ঘদিনের হলেও এবারের বাজেটে এর চূড়ান্ত সমাধান চেয়েছে সংগঠনটি।
আলোচনা সভায় বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ কর-জিডিপি অনুপাতের সঠিকতা যাচাই করার পরামর্শ দেন। তিনি অভিযোগ করেন, যারা নিয়মিত কর জালে আছেন, তাদের ওপরই বারবার চাপের সৃষ্টি করা হয়, যা কাম্য নয়। সভায় সংবাদপত্র ও প্রকাশনা শিল্পের অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত থেকে তাদের সংকটের কথা তুলে ধরেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান নোয়াব নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, সংবাদপত্রশিল্পের করপোরেট কর অন্তত বাড়বে না, এটা নিশ্চিত করতে পারি। অন্যান্য শুল্ক ও করের বিষয়ে আমরা যৌক্তিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব।
সংবাদপত্র কেবল একটি পণ্য নয়, এটি গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সঠিক তথ্য প্রবাহ এবং জনমত গঠনে এর ভূমিকা অপরিসীম। নোয়াব নেতারা মনে করেন, গত কয়েক বছরের মহামারীর ধাক্কা এবং বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় এই শিল্পকে যদি বিশেষ প্রণোদনা বা কর ছাড় দেওয়া না হয়, তবে অনেক নামী সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে কর্মসংস্থান হারানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকারও খর্ব হবে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬