যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা, তদন্তে উঠে এলো লোমহর্ষক সব তথ্য
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন ভয়াবহ তথ্য। এ ঘটনায় অভিযুক্ত রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ গঠন করেছে আদালত। তদন্তকারীরা বলছেন, হত্যার পর প্রমাণ গোপন করার উপায় জানতে অভিযুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটের সাহায্যও নিয়েছিলেন।
গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার এই দুই শিক্ষার্থী। প্রায় ১০ দিন পর লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ধারণা করছে, একই কায়দায় বৃষ্টিকেও হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়েছে। সম্প্রতি হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু দেহাংশ বৃষ্টির হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। স্থানীয় সময় ২৮ এপ্রিল আদালত তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রসিকিউটররা আদালতে একটি বিস্তারিত সময়রেখা তুলে ধরে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের নানা কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন।
তদন্তে জানা গেছে, ১৬ এপ্রিল ছিল লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে তাদের পরিচিতদের শেষ যোগাযোগের দিন। দুপুরে বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা গেলেও সন্ধ্যার একটি নির্ধারিত সাক্ষাতে তিনি আর উপস্থিত হননি। অন্যদিকে লিমনের ফোনের অবস্থান প্রথমে বাসা ও ক্যাম্পাস এলাকায় থাকলেও পরে ক্লিয়ারওয়াটার অঞ্চলে চলে যায়। একই সময়ে অভিযুক্তের গাড়িও ওই এলাকায় দেখা গেছে।
সেই রাতেই সন্দেহভাজনের ফোন থেকে অনলাইনে বড় আকারের ময়লার ব্যাগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রীসহ বিভিন্ন জিনিস অর্ডার করা হয়। গভীর রাতে তাকে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বাক্স নিয়ে আবর্জনার স্থানে যেতে দেখা যায়। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত একাধিকবার একটি সেতু এলাকায় যাতায়াতও করেন তিনি।
তদন্তকারীরা আদালতে জানান, অভিযুক্ত চ্যাটবটের সঙ্গে কথোপকথনে জানতে চেয়েছিলেন—মৃতদেহ ময়লার ব্যাগে ভরে ফেলে দিলে কী হয় এবং তা কীভাবে ধরা পড়তে পারে। এছাড়া তিনি একটি নির্দিষ্ট পার্কে গাড়ি তল্লাশি হয় কি না, সে বিষয়েও জানতে চান।
১৭ এপ্রিল দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরদিন বৃষ্টির কর্মস্থলে তল্লাশি চালিয়ে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়। ২৩ এপ্রিল তদন্তকারীরা একটি আবর্জনার স্থানে তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা ফ্লোর ম্যাট, মোবাইল কভার, লিমনের মানিব্যাগ ও পোশাক উদ্ধার করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত বারবার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন। প্রথমে ক্লিয়ারওয়াটারে যাওয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে মাছ ধরার অজুহাত দেন, এরপর আবার বলেন তিনি ভুক্তভোগীদের সেখানে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতু এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একটি কালো ব্যাগ থেকে দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়, যা পরে লিমনের বলে শনাক্ত হয়। তদন্তকারীরা জানান, ব্যাগটি অভিযুক্তের ঘরে পাওয়া ব্যাগের সঙ্গে মিল রয়েছে।
২৬ এপ্রিল একই এলাকায় আরও কিছু মানবদেহের অংশ পাওয়া যায়, যা বৃষ্টির হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা চলছে।
২২ এপ্রিল অভিযুক্তের মায়ের সঙ্গে কথা বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, তার ছেলে আগে থেকেই রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় ভুগতেন এবং পরিবারের সঙ্গে সহিংস আচরণ করতেন।
২৫ এপ্রিল প্রথমবার আদালতে তোলা হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও মৃতদেহ গোপন, প্রমাণ নষ্ট, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ আনা হয়। ২৮ এপ্রিল শুনানিতে বিচারক লোগান মারফি তাকে জামিন ছাড়াই কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন এবং সাক্ষী বা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি দেশে তাদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। লিমনের মরদেহ শনাক্ত হলেও বৃষ্টির সন্ধানে এখনো তল্লাশি ও পরীক্ষার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনাটির প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬