সংস্কার বাস্তবায়নে পিছু হটছে সরকার
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান দুর্বল বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কিছু অধ্যাদেশের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের অবস্থান ইতিবাচক হলেও কিছু বিষয়ে তারা পেছনের দিকে হাঁটছে। অথচ যেসব বিষয়ে এখন বিএনপি শক্ত অবস্থান থেকে বিরত রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারাই এটার প্রধান শিকার হয়েছিলেন। এ থেকে তাদেরও শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে টিআইবির অবস্থান’ জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গতকাল সোমবার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান লিখিত বক্তব্য তুলে ধরার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
তিনি বলেন, অধ্যাদেশ নিয়ে যে খেলাটা হচ্ছে, সেখানেও আগের মতো ভেতর থেকে প্রতিরোধ আসছে। এখানে দুটি আঙ্গিক আছে। রাজনীতি ও আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রই এখনও আগের মতোই মূল নিয়ন্ত্রক।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। আর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে আরও বেশি যুগোপযোগী করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। তাদের দুজনের কথার ওপর আস্থা রাখতে চাই। তবে কঠিন হচ্ছে, আস্থা রাখাটা। কারণ তারা যেটি বলছেন, সেটি কাজে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না।
তিনি আরও বলেন, ৯৮টি অধ্যাদেশ সরকার হুবহু গ্রহণ করার বিষয়টি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে আইনে পরিণত হতে যাওয়া সব অধ্যাদেশের সবই দুর্বলতাহীন নয়, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। যেমন সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ এবং স্থানীয় সরকারবিষয়ক চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশ।
টিআইবি বলছে, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশে এখনও যে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে, তা মহাহিসাব নিরীক্ষকের সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থি। কেননা সরকার হিসেবে প্রাপ্য সব রাজস্ব ও প্রাপ্ত প্রচলিত আইন, বিধি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিরূপণ এবং সঠিকভাবে জমা ও হিসাবভুক্ত হয়েছে কিনা– তা নিরীক্ষার সুযোগ বর্তমান অধ্যাদেশে রাখা হয়নি। এর ফলে সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থায় জবাবদিহি কমবে। রাজস্ব নিরূপণ-আদায়ে অনিয়ম ও কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ হারাবে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান। এটাকে রাজস্ব আদায় ও নিরূপণ কার্যক্রমে যোগসাজশমূলক অনিয়ম ও কারসাজির দায়মুক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
স্থানীয় সরকারবিষয়ক চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় দুষ্ট। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার যেমন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা হয়। সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নির্বাচিত সরকারও নিজের ইচ্ছামতো জনপ্রতিনিধিকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করতে চাইছে, যা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থি।
অন্যদিকে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, যা চরম দুর্বলতার কারণে সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য, সেটিতে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে অধিকতর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার বিধান সংযুক্ত করে বিল আকারে পাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এটি হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
টিআইবি আশা প্রকাশ করে, বিএনপি অতীতে নিজেদের অনাচারের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগকে স্মরণে রেখে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের নিজস্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ করবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু আইনে পরিণত করার জন্য সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুদক ও গুম প্রতিরোধে করা জনগুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটিসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই আইনে পরিণত না করে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নতুন করে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। আর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয়বিষয়ক তিনটিসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করতে সুপারিশ করেছে ওই বিশেষ কমিটি। বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক তিনটি অধ্যাদেশকে রহিত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এই তিনটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কোনো সময়সীমাও ঠিক করেনি বা ভবিষ্যতে করা হবে, তার ইঙ্গিতও দেয়নি। দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার কমিশন, দুদকসহ ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী করে আনার কথা বলা হয়েছে। যদিও সেই সময়কাল সুনির্দিষ্ট নয়। তৃতীয় ধাপে থাকা পুলিশ কমিশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এনে পাসের কথা বলা হয়েছে। যদিও এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং গুম প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত অধ্যাদেশগুলো এখনই পাস করতে আগ্রহী নয় সরকার। বরং পরে আগ্রহী বলে তারা জানিয়েছে। এখানে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত বিধানের অভাবে মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে, তার ভুক্তভোগী ক্ষমতাসীন দলটি এর প্রয়োজনীয়তা কেন এখনও উপলব্ধি করতে পারছে না। যেসব বিষয় সামনে রেখে আলোচিত অধ্যাদেশগুলোকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া হলো তা আরও বেশি শঙ্কা ও উদ্বেগের। কারণ কমিশনকে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের অধীনে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের আগে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে আদালতের অনুমতির কথা বলা হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানুষ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাও যা, সেনাসদস্যও তাই। কাজেই একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিধান যৌক্তিক নয়।
তিনি বলেন, এর ফলে কমিশনের প্রশাসনিক স্বাধীনতা খর্ব হবে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা এবং বিচারিক ক্ষমতাকে নির্বাহী ক্ষমতায় রূপান্তরের শঙ্কা রয়েছে। এই অধ্যাদেশ দুটির অনুপস্থিতি ‘অপশনাল প্রটোকল টু দ্য কনভেনশন এগেইনস্ট টরচার (ওপিসিএটি)’ এবং ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’র মতো আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করবে। এমন বাস্তবতা বিবেচনায় কমিশনকে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করার পরিবর্তে কার্যকর মানবাধিকার কমিশনে রূপান্তর করা না গেলে এবং গুম প্রতিরোধ আইনে ব্যত্যয় করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
বর্তমান সংসদে বাতিলের সুপারিশ করা সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রাখা হোক, তা চায় টিআইবি। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, নিয়োগ অধ্যাদেশটি রহিত করায় বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আবারও পুরোনো ধারায় ফিরে যাবে বা সরকারপ্রধানের ইচ্ছামাফিক হয়ে পড়বে। এটি এক পা এগিয়ে দুই পা পেছনে হাঁটার শামিল। আর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করার পেছনে সরকার যেসব যুক্তি তুলে ধরছে, তার সারমর্ম হচ্ছে বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতের পথ রুদ্ধ করে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ছয়টি অধ্যাদেশ পুনর্মূল্যায়ন বা সংশোধন করা জরুরি বলে মনে করে টিআইবি। এগুলো হলো– দুদক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার সংশোধন অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ।
আরও দুটি অধ্যাদেশ টিআইবি বাতিল চায়। সেগুলো হলো পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ। এ প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশকে একটি পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন, তার কোনো প্রতিফলনই পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে হয়নি। এর অধীনে কমিশন হলে তা মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। আর উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে এমন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক ও সেবাদাতা। এটি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। বর্তমান সরকার সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে চাইছে। এ ব্যাপারে টিআইবির অবস্থান কী– সেই প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ব্যাপারে টিআইবির কোনো গবেষণা নেই। আমারও কোনো গবেষণা নেই। কাজেই এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও নীতি পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, পরিচালক (আউটরিচ ও কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬