|
প্রিন্টের সময়কালঃ ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৪৭ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১১:২১ পূর্বাহ্ণ

হামে যমজ কন্যা হারিয়ে পাগলপ্রায় মা-বাবা


হামে যমজ কন্যা হারিয়ে পাগলপ্রায় মা-বাবা


সাত মাস বয়সী যমজ কন্যা রৌশনী ও হাফিজাকে ঘিরে ছিল বাবা-মায়ের সুখের সংসার। কক্সবাজারের রামু উপজেলার মিঠাছড়ি গ্রামের মরিয়ম বেগম ও আজিজুল হকের ঘরে ছিল হাসি; ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ সেই আলো নিভে গেল হামের নির্মম থাবায়।

 

ঈদের আনন্দ শেষ হতে না হতেই শুরু হয় তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই। জ্বর, কাশি ও সর্দি নিয়ে তাদের গত ২২ মার্চ স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা এক সপ্তাহ চিকিৎসা নেওয়ার পরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শিশু দুটিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। গত শুক্রবার মারা যায় রৌশনী। পরদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে হাফিজাও। হামে দুই কন্যা হারিয়ে নিঃস্ব বাবা-মা। শোকে তারা পাগলপ্রায়।

 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মরিয়ম বেগম বলেন, দুটো বাচ্চাই আমার চোখের সামনে শেষ হয়ে গেল! কিছুই করতে পারলাম না। কত ডাক্তার দেখালাম, কত চেষ্টা করলাম; কিছুই কাজে লাগল না। শোকাহত আজিজুল হক বলেন, আমরা কোনো চেষ্টা বাদ রাখিনি। কক্সবাজারে চিকিৎসা করিয়েছি, চট্টগ্রামে নেওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। কিন্তু সময় পেলাম না। এক দিনের ব্যবধানে দুই মেয়েকেই হারালাম। 

 

মরিয়ম-আজিজ দম্পতির এই ট্র্যাজেডি এখন আর একক ঘটনা নয়। কক্সবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। 

 

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের অনেক সময় সাধারণ রোগীদের সঙ্গে রাখতে হচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে জেলায় বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে অন্তত ৭৫ শিশু। গত এক সপ্তাহেই আক্রান্ত হয়েছে ১৩২ জন।

 

সারাদেশে সাত শিশুর মৃত্যু
হামে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৯৭টি শিশু। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ জনের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

 

গত ২৪ ঘণ্টায় ‘সন্দেহজনক হাম’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এই সংখ্যা ২৩৮ জন। এরপর রয়েছে যথাক্রমে রাজশাহী (৯১), চট্টগ্রাম (৮৭), খুলনা (৬৩), সিলেট (৩৭), রংপুর (৩০), ময়মনসিংহ (২২) ও বরিশালে (২৯)।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৩ দিনে হামের উপসর্গ সন্দেহজনক হাম নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৮ শিশুর। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা এক হাজার ৯৯ জন। এ ছাড়া গত ২৩ দিনে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা আট হাজার ৫৩৪ জনের মধ্যে ভর্তি হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৪০ জন। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে ছয় হাজার ১৬ জন।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত রোববার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলায় টিকা পেয়েছে ৪৯ হাজার ৯০০ জন। গতকাল দ্বিতীয় দিনও এই কর্মসূচি চলমান রয়েছে। তবে কত টিকা দেওয়া হয়েছে এই তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

 

সিলেটে প্রথম মৃত্যু, বাড়ছে সংক্রমণ
সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দুপুরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেটে এটিই প্রথম মৃত্যুর ঘটনা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

 

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির বলেন, দুই দিন আগে শিশুটিকে হাম ও হৃদযন্ত্রের জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আইসিইউতে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।


সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ১০১ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ভর্তি আছে ৬২ জন। এ পর্যন্ত বিভাগে ৩৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

 

বরগুনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
বরগুনায় হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় ১৬৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। পরীক্ষাগারে পাঠানো ৯২টি নমুনার মধ্যে ৩৩টিতে হাম শনাক্ত হয়েছে। জেলায় এরই মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৩৩ জন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত টিকাদান না হওয়া এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকা নেওয়া শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, ফলে বিষয়টি আরও গবেষণার দাবি রাখে। 

 

বরিশাল বিভাগে ৯ শিশুর মৃত্যু
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় এখন পর্যন্ত ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের ‘সন্দেহজনক হাম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চারটি উপজেলাকে প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে আনা হচ্ছে, ফলে নমুনা সংগ্রহ ও নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহ ‘হটস্পট’ 
চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে হামের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের অধিকাংশ ৯ মাসের কম বয়সী এবং টিকাবঞ্চিত। জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে ১৪ শয্যার ওয়ার্ডে গাদাগাদি করে কয়েকগুণ বেশি রোগী রাখা হচ্ছে। আইসোলেশন সেন্টারও অস্থায়ীভাবে চালানো হচ্ছে। 

 

চিকিৎসকরা বলছেন, দেরিতে হাসপাতালে আসা, টিকা না নেওয়া এবং অপ্রচলিত চিকিৎসার কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে। হামের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। আগে যেখানে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যেত, এখন তা এক মাস পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। এতে রোগ শনাক্তের আগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহের তিন উপজেলাকে ‘হটস্পট’ ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে দেড় লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার কর্মসূচি চলছে।

 

পাবনায় শয্যা সংকট
পাবনা জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ। শিশু ওয়ার্ডে বেডের অভাবে অনেক শিশুকে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আইসিইউ সুবিধা না থাকায় গুরুতর রোগীদের অন্যত্র পাঠাতে হচ্ছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া, প্রচারণার অভাব এবং জনবল সংকট– এই তিন কারণে হামের প্রকোপ বেড়েছে। তারা বলছেন, দ্রুত টিকাদান জোরদার, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।


 


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬