|
প্রিন্টের সময়কালঃ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:১৭ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৩৮ অপরাহ্ণ

সিদ্ধান্ত ১৭ পয়সা, বাস্তবে দ্বিগুণের বেশি বাড়ছে বাসভাড়া


সিদ্ধান্ত ১৭ পয়সা, বাস্তবে দ্বিগুণের বেশি বাড়ছে বাসভাড়া


নিজস্ব প্রতিবেদক


 

ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর নন-এসি বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। কোথাও কোথাও নির্ধারিত হারের দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
 

মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকে নতুন ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে সোমবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বৈঠকে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং ঢাকা-চট্টগ্রামসহ নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে পর্যালোচনা করে ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
 

সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ২০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকলেও পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ১৭ পয়সা বৃদ্ধিতে সম্মত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী ডিজেলের দাম এক টাকা বাড়লে বাসভাড়া কিলোমিটারে এক পয়সা বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকে। সে হিসাবে এবার ২০ পয়সা বাড়ানোর কথা থাকলেও সরকার ১৭ পয়সা নির্ধারণ করেছে।
 

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫২ আসনের দূরপাল্লার নন-এসি বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হবে। নগর পরিবহনে তা ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হবে।
 

তবে বাস্তবে ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কারণ দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ৫২ আসন ধরে নির্ধারণ করা হলেও অধিকাংশ বাসে আসন রয়েছে ৪০টি। আরামদায়ক যাত্রার জন্য কিছু বাসে ৩২ থেকে ৩৬টি আসনও থাকে। আসনসংখ্যা কম হলে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বাড়ে।
 

৪০ আসনের দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ১২ পয়সা হতে পারে। অর্থাৎ ৫২ আসনের বাসে ১৭ পয়সা বাড়লেও ৪০ আসনের বাসে বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে ২২ পয়সা।
 

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার। এ হিসাবে ৪০ আসনের বাসে ভাড়া প্রায় ৫৫ টাকা বাড়তে পারে। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে বর্তমান ৩৩৫ টাকা ভাড়া বেড়ে ৩৬০ টাকা হতে পারে। এর সঙ্গে বিভিন্ন রুটে সেতুর টোল ও ফেরি পারাপারের খরচও যুক্ত হতে পারে।
 

এদিকে প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও ১০০ টাকা বা তারও বেশি বাড়তি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা-বরিশাল রুটে ১০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অথচ ১৮১ কিলোমিটার দূরত্ব বিবেচনায় এ রুটে ভাড়া প্রায় ৪০ টাকা বাড়ার কথা।
 

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মতিঝিলের দূরত্ব প্রায় ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এ রুটে নির্ধারিত ভাড়া ২৪ টাকা হলেও আগে থেকেই বিভিন্ন বাসে ২৫ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হতো। ডিজেলের দাম বাড়ার পর সিটি ও রজনীগন্ধাসহ কয়েকটি বাসে ৩৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ১৭ পয়সা বাড়লেও নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী ভাড়া হওয়ার কথা প্রায় ২৬ টাকা।
 

সিটি পরিবহনের চালকের সহকারী নজরুল ইসলাম বলেন, মালিকের নির্দেশে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত ৩৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ডিজেলের বর্তমান দামে এর চেয়ে কম ভাড়ায় বাস চালানো সম্ভব নয় বলে তিনি দাবি করেন।
 

বাসযাত্রী আকবর হোসেন বলেন, যাতায়াতে প্রতিদিন ২০ টাকা বাড়তি খরচ হলে মাসে ২৫ দিনে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা ব্যয় হবে। আয় না বাড়লেও এ বাড়তি খরচ কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
 

তবে কিছু বাস এখনও এপ্রিল মাসে নির্ধারিত ভাড়ায় চলছে। এসব পরিবহন নতুন ভাড়ার তালিকার অপেক্ষায় রয়েছে। চালকদের দাবি, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পুরোনো ভাড়ায় বাস চালিয়ে লোকসান হচ্ছে।
 

মৌলভীবাজারে রুটভেদে ভাড়ায় পার্থক্য

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, জেলার আন্তঃজেলা মিনিবাসে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তবে মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল রুটে কিছু পরিবহন আগের ভাড়াই বহাল রেখেছে। একই দূরত্বে বিভিন্ন পরিবহনে ভিন্ন ভাড়া নেওয়ায় যাত্রী ও শ্রমিকদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
 

সিলেট-মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল রুটে চলাচলকারী এসএমএস পরিবহনের মিনিবাসে আগে ১৭০ টাকা নেওয়া হলেও মঙ্গলবার থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার রুটেও ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। মালিক সমিতির প্যাডে লিখিত সিদ্ধান্ত দেখিয়ে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
 

এসএমএস পরিবহনের সচিব আব্দুর রব বলেন, এপ্রিলে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও তা কার্যকর করা হয়নি। কিন্তু এবার ডিজেলের দাম বাড়ায় পুরোনো ভাড়ায় পরিবহন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
 

মৌলভীবাজার মিনিবাস মালিক সমিতির চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম রিপন বলেন, পরিবহন মালিকদের আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ায় প্রজ্ঞাপন জারির আগেই ভাড়া বাড়াতে হয়েছে।
 

নাটোরে ৩০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ

নাটোর সংবাদদাতা জানান, বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। নাটোর শহরের মাদ্রাসা মোড় ও হরিশপুর বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহী থেকে নাটোরের আন্তঃজেলা বাসে আগে ৭০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও সোমবার থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
 

রাজশাহী থেকে আসা যাত্রী শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত ৩০ টাকা দিতে আপত্তি জানালে তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
 

বগুড়ার পণ্য ব্যবসায়ী দোলন আলী বলেন, নাটোর থেকে পণ্য কিনে বাসে বগুড়া যাওয়ার সময় ৮ থেকে ১০ কার্টনের জন্য আগে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দিতে হতো। এখন একই পণ্যের জন্য ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা দিতে হচ্ছে।
 

নাটোরের একটি বাস কাউন্টারের মাস্টার বিলাস বলেন, নাটোর-রাজশাহী রুটে ১০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এতদিন কম ভাড়া রাখা হলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।
 

সিরাজগঞ্জে যাত্রী কমার দাবি

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভাড়া বৃদ্ধির কারণে যাত্রী সংখ্যা কমেছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১২৮ কিলোমিটার। নন-এসি বাসে এ রুটের ভাড়া ৪০০ টাকা।
 

এসআই পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক রাকিব হোসেন বলেন, ঢাকা যাওয়া-আসায় একটি বাসে ৮০ থেকে ৯০ লিটার ডিজেল লাগে। ডিজেলের নতুন দামে প্রতি ট্রিপে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
 

উল্লেখ্য, রোববার রাতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন নন-এসি বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়।
 

নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার আগেই বিভিন্ন রুটে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের পর প্রকৃতপক্ষে কোন রুটে কত ভাড়া কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট হবে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক)     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬