|
প্রিন্টের সময়কালঃ ১১ আগu ২০২৬ ০৫:৫৬ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ১১ আগu ২০২৬ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

রাজনৈতিক বার্তা দিতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট


রাজনৈতিক বার্তা দিতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট


নিজস্ব প্রতিবেদক:


 

সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট না থাকায় পরাজয় নিশ্চিত জেনেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোট নেতাদের দাবি, নির্বাচনে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য জয়-পরাজয় নয়; বরং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়টি সামনে আনা।
 

জোট গঠনের সময় এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাও প্রার্থী দেওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।
 

সংসদে প্রয়োজনীয় ভোট না থাকায় অলি আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী কি না, তা নিয়ে জোটের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা হয়। তিনি প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ১১ দলীয় জোট। জোটের মূল্যায়ন, এর মাধ্যমে একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার পাশাপাশি তাঁকে নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ে রাখা সম্ভব হবে।
 

জোটের নেতারা মনে করছেন, স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নিয়মিত সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধা ও কওমি ঘরানার আলেমদের পাশে রাখার কৌশল নিয়েছে দলটি। স্বাধীনতার প্রথম দিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা ঘোষণায় অলি আহমদের ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আনছেন জোটের নেতারা।
 

অলি আহমাদ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ফলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে জিয়াউর রহমানের ভাবমূর্তিকে যতটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে, অলি আহমদের রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে তার কিছুটা নিজেদের দিকে আনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত।
 

তবে ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের কাছে জয়-পরাজয়ের চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, অতীতে টানা সাতবার রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবার সেই ধারার বাইরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
 

সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, সংসদের ৩৫০ জন সদস্যই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার।
 

আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্য ভোট দেবেন। প্রতিটি ব্যালট পেপারে ভোটারের নাম ও বিভক্তি সংখ্যা থাকে এবং প্রার্থীর নামের পাশে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট দিতে হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলেও ভোটারকে নিজ নাম স্বাক্ষর করতে হয়।
 

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগও সীমিত। কোনো সংসদ সদস্য দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
 

বর্তমান সংসদে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ জন এমপি রয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির এককভাবে রয়েছে ২৪৭ জন এমপি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। ফলে বর্তমান সংসদীয় সমীকরণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 

অলি আহমদকে প্রার্থী করার বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে প্রকাশ্য ভোটের বিধান রয়েছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন দল গোপন ব্যালটে নির্বাচনের বিষয়ে একমত হলেও বর্তমানে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
 

তাঁর মতে, সংবিধান সংস্কারের আগে শুধু আইন সংশোধন করেও গোপন ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা করা সম্ভব। ১১ দলীয় জোট ও এনসিপি জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন চায়। কিন্তু বিএনপি অন্যান্য বিষয়ের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও জুলাই সনদের বিধান মানছে না। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরতেই ১১ দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
 

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণে ১১ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বিএনপি জাতির সামনে এমন কোনো প্রার্থী হাজির করতে পারেনি, যিনি সর্বজনগ্রাহ্য। সংস্কার প্রক্রিয়ার সময় রাষ্ট্রপতিসহ সাংবিধানিক পদগুলোতে আলোচনা করে নিয়োগের প্রস্তাব ছিল, যাতে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিদের এসব পদে আনা যায়।
 

১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায় ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। জাতীয় পার্টির ৩৫ এমপি ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। ওই নির্বাচনে জামায়াতের ১৮ জন এমপি বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দেন।
 

এরপর প্রায় ৩৫ বছর ধরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছেন। এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের আয়োজন হতে যাচ্ছে।
 

পরাজয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম, যোগ্য, পরিচ্ছন্ন ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করতে যাচ্ছেন। তাঁর দাবি, জামায়াত সবসময় দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করেছে। এর আগে জুলাই আন্দোলনের এক শহীদের মাকেও সংসদ সদস্য করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
 

জোট নেতাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে অলি আহমাদের প্রতি দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা হবে, অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ, গোপন ব্যালটে ভোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়গুলোও জাতীয় আলোচনায় থাকবে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক)     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬