ফের চোখ রাঙাচ্ছে ম্যালেরিয়া
দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে থাকার পর দেশে আবারও নতুন করে আশঙ্কার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ম্যালেরিয়া’। এক সময়ের প্রায় নির্মূল হতে চলা এই রোগটি বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামপ্রতিক পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, গত দুই বছর ধরে সংক্রমণের হার কেবল ঊর্ধ্বমুখীই নয়, বরং তা পূর্বের রেকর্ডগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিশেষ করে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো দুর্গম জনপদগুলোতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, যা এখন শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ থাকা, মশার নিয়মিত জরিপ না হওয়া এবং সীমান্তবর্তী চলাচলের কারণে ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম এক ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়েছে।
পর্যটন বৃদ্ধির ফলে পার্বত্য অঞ্চল থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অজ্ঞাতসারেই জীবাণু বহন করে সমতলে নিয়ে আসছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মশার বংশবিস্তার, অন্যদিকে রোগ নির্ণয়ে দীর্ঘসূত্রতা- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একটি জনগুরুত্বপূর্ণ রোগ যখন নির্মূলের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফের ফিরে আসে, তখন তা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কাঠামোর দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত নজরদারি বৃদ্ধি এবং গণসচেতনতা নিশ্চিত করা না গেলে, ম্যালেরিয়া আবারও এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্ধকারে সরকার, দুই বছর নেই কোনো জরিপ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ম্যালেরিয়া রোগের বর্তমান প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকার অনেকটা অন্ধকারে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার মাস অন্তর মশার জরিপ হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছর দেশে কোনো জরিপ করা হয়নি। এমনকি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের ‘ডেথ রিভিউ’ বা মৃত্যু পরবর্তী বিশ্লেষণও থমকে আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে ঢাকা শহরে ম্যালেরিয়ার বাহক ‘অ্যানাফিলিস’ মশার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই মশাগুলো ম্যালেরিয়াজীবাণুবাহী কি না, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। যদি এগুলো স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ শুরু করে, তবে জনাকীর্ণ রাজধানী শহর বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে।
সংক্রমণের পরিসংখ্যান ও হটস্পট- শীর্ষে বান্দরবান : বিগত এক দশকে ম্যালেরিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও ২০২২ সাল থেকে ফের বাড়তে শুরু করেছে এই সংক্রমণ। সামপ্রতিক পরিসংখ্যান— ২০২৩ সাল: ওই বছর ১৩টি জেলায় মোট ১০ হাজার ১৬২ জন আক্রান্ত হয় এবং ১৬ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সাল (প্রথম ৩ মাস): বছরের শুরুতেই ৪৬০ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
হটস্পট বান্দরবান: দেশের মোট রোগীর প্রায় ৫০ শতাংশই বান্দরবান জেলার। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ২৩ জন। অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জেলা: রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬১৪ জন, কক্সবাজারে ৮৪৫ জন এবং খাগড়াছড়িতে ৫৩৪ জন আক্রান্তের সন্ধান মিলেছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ২২৫ থাকলেও করোনা মহামারির সময় (২০২০-২১) যাতায়াত সীমিত থাকায় এই সংখ্যা অনেক কমে এসেছিল। তবে গত দুই বছর ধরে সংক্রমণের হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী।
নির্মূল কার্যক্রম থমকে যাওয়ার কারণ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে গ্লোবাল ফান্ডের কিছু সহায়তা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। প্রধান অন্তরায়সমূহ— ১. সেক্টর কর্মসূচি বাতিল: বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতের সেক্টর কর্মসূচি বা অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বাতিল করায় ম্যালেরিয়া দমনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে।
২. পর্যটন ও সীমান্ত চলাচল: সীমান্তবর্তী এলাকায় অবাধ যাতায়াত এবং পর্যটন বৃদ্ধির ফলে ম্যালেরিয়া জীবাণু এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
৩. সচেতনতার অভাব: পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণকারী পর্যটকরা যথাযথ সতর্কতা (যেমন: রিপেলেন্ট ব্যবহার বা মশারি) অবলম্বন না করায় তারা সংক্রমণ নিয়ে শহরে ফিরছেন।
৪. বিলম্বিত রোগ নির্ণয়: শহরে অনেক সময় জ্বর হলে চিকিৎসকরা ম্যালেরিয়ার কথা মাথায় আনেন না, ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হওয়ায় জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কতা ও করণীয় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ম্যালেরিয়ার ওষুধ কেবল সরকারিভাবেই বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। তাই জ্বর হলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষ করে যারা গত ১৪ দিনের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি নিয়ন্ত্রিত রোগের ক্ষেত্রে উদাসীন হলে সেটির পুনঃসংক্রমণ স্বাভাবিক। নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা যখন এগোচ্ছিলাম, ঠিক তখনই প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে কাজে স্থবিরতা এসেছে। এখনই সঠিক পরিকল্পনা ও বরাদ্দ নিশ্চিত করা না হলে ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’
পরিশেষে বলা যায়, ম্যালেরিয়া নির্মূলের পথে বাংলাদেশের গত এক দশকের সাফল্য আজ এক নাজুক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা- এই দুইয়ের সমন্বয়ে ম্যালেরিয়া যেভাবে আবারও ‘চোখ রাঙাতে’ শুরু করেছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অশনিসংকেত। কেবল গ্লোবাল ফান্ডের সহায়তায় বা খণ্ডকালীন পরিকল্পনায় এই নীরব ঘাতককে রুখে দেয়া সম্ভব নয়।
এজন্য প্রয়োজন স্থগিত হওয়া অপারেশন প্ল্যানগুলোর দ্রুত পুনর্বহাল, নিয়মিত মশা জরিপ এবং প্রতিটি জ্বরের সঠিক ও দ্রুত রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
মনে রাখতে হবে, একটি সংক্রামক রোগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষের জীবন দিয়ে। তাই ম্যালেরিয়াকে সমূলে উৎপাটন করে ‘ম্যালেরিয়ামুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নতুবা সোনালি অতীতের অর্জনগুলো অচিরেই ধূলিস্যাৎ হয়ে যেতে পারে।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬