|
প্রিন্টের সময়কালঃ ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩২ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৩৮ অপরাহ্ণ

নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি, বহুমাত্রিক সংকটে নতুন সরকারের অগ্নিপরীক্ষা


নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি, বহুমাত্রিক সংকটে নতুন সরকারের অগ্নিপরীক্ষা


বাংলাদেশি অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যাকে বিশ্লেষকেরা বলছেন ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা চতুর্মুখী সংকটের সম্মিলন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির বিনিয়োগ, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত এবং তার ওপর নতুন করে যুক্ত হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।

গত তিন বছরের ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং দারিদ্র্যের হার পুনরুত্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে নতুন সরকারের সামনে এখন কেবল উন্নয়নের গল্প নয়, বরং অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান।

মূল্যস্ফীতির যাঁতাকল: আয়ের চেয়ে ব্যয় যখন বেশি

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নের নাম মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘ সময় ধরে এটি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮.৭১ শতাংশ, সেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮.০৯ শতাংশ। এই গাণিতিক ব্যবধানটিই বলে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সংকুচিত হয়েছে।

যখন মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়, তখন তারা ভোগের পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং সঞ্চয়ে মনোযোগী হয়। এর একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। চাহিদা কমে গেলে উৎপাদন কমে, আর উৎপাদন কমলে শিল্পায়নের গতি শ্লথ হয়ে যায়। বাংলাদেশ এখন ঠিক এই চক্রেই আটকা পড়েছে। সরকার নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করলেও বাজারে এর সুফল মিলতে সময় লাগছে, যা সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

প্রবৃদ্ধির মোহ বনাম স্থিতিশীলতার বাস্তবতা

গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩.৪৯ শতাংশে। টানা তিন বছরের এই নিম্নমুখী প্রবণতা প্রমাণ করে যে, অর্থনীতি তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে ছোটা হবে আত্মঘাতী। সরকারকে এখন প্রথমত ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি’ বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির চাকাকে জোর করে ঘোরানো সম্ভব নয়। যদিও নতুন সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কিন্তু বর্তমান ৩.৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ও তরুণদের অনিশ্চয়তা

বিগত এক দশকের প্রবৃদ্ধিকে ‘জবলেস গ্রোথ’ বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বলা হচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম হলেও কাজ পেয়েছেন মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক তরুণ শ্রমবাজারের বাইরে থেকে গেছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মধ্যে বেকারের হার ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। নারীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও ভয়াবহ। শহরের নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৩১ শতাংশ থেকে কমে ২৫ শতাংশে নেমেছে। শিল্প খাতে কর্মসংস্থান না বাড়ায় শিক্ষিত যুবসমাজ আজ দিশেহারা, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

বিনিয়োগের আকাল ও আস্থার সংকট

বেসরকারি বিনিয়োগের অবস্থা এখন মহামারিকালীন সময়ের চেয়েও খারাপ। এর প্রধান কারণ ‘অলিগার্ক’ বা অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব। বিগত শাসনামলে একচ্ছত্র রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ন্ত্রণ করত, যা সাধারণ ও সৎ উদ্যোক্তাদের বাজার থেকে ছিটকে দিয়েছে।

বর্তমানে সরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩.৫৭ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এর অর্থ হলো, ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী, যার ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা মূলধন সংকটে ভুগছেন। এছাড়া উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকট বিনিয়োগের পথে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক খাত: খেলাপি ঋণের মহাসাগর

ব্যাংক খাত এখন অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বলতম জায়গা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে থাকা বাঞ্ছনীয় হলেও বাংলাদেশে তা এখন ৩৫.৭৩ শতাংশে (প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা) পৌঁছেছে। যদিও বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতফসিল করে এটিকে ৩০.৬০ শতাংশে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবচিত্র আরও ভয়াবহ।

বিগত সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া ব্যাংক লাইসেন্স এবং প্রভাবশালীদের বিচারহীনতা এই খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবং ব্যাংক সংস্কারের ধীরগতি বিনিয়োগকারীদের মনে শঙ্কা জাগিয়ে রাখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই খাত থেকে সুফল পাওয়া দুষ্কর।

বৈষম্যের বিস্তার: মধ্যবিত্তের বিলুপ্তি

বাংলাদেশ এখন উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ। জিনি অনুপাত ০.৪৯৯ হওয়া মানে হলো দেশের সম্পদের সিংহভাগ মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কুক্ষিগত। জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশই এখন এই ১০ শতাংশ ধনী মানুষের দখলে। অন্যদিকে মধ্যবিত্তের আয় সংকুচিত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ছোট হয়ে আসছে। 

দারিদ্র্য বিমোচনের গতিও কমে গেছে; ২০১৬ সালের আগে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে যে পরিমাণ দারিদ্র্য কমত, এখন তার চেয়ে অনেক কম কমছে। বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি: ইরান যুদ্ধের অভিঘাত

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। জ্বালানির দাম বাড়লে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়বে, অন্যদিকে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়বে। সরকার যদি ভর্তুকি কমাতে জ্বালানির দাম বাড়ায়, তবে তা আবার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। এই উভয়সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সহজ পথ আপাতত দৃশ্যমান নয়।

রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের বোঝা

সরকারের আয় বা রাজস্ব আদায়ের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিচ্ছে, যা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যেমন বেকার ভাতা বা কৃষিঋণ মওকুফ পূরণের জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, তা জোগাড় করা এখন সরকারের জন্য হিমালয় জয়ের মতো কঠিন।অর্থনীতি কি গভীর সংকটে? উত্তরটি হলো হ্যাঁ। তবে এই সংকট থেকে ফেরার পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারকে এখন তিনটি ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে:

১. কাঠামোগত সংস্কার: ব্যাংক ও রাজস্ব প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।
২. আস্থা পুনরুদ্ধার: অলিগার্কদের প্রভাব কমিয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।
৩. অগ্রাধিকার নির্ধারণ: রাজনীতির চাপে পড়ে অর্থহীন ব্যয় না করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেওয়া।

নতুন গভর্নর ও নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে এই সংকট কেবল গভীর নয়, দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬