হামের ভয়াবহতার মাঝেই ভয় দেখাচ্ছে ডেঙ্গু
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর মশার উপদ্রব নতুন করে বেড়েছে। তবে এবার কিউলেক্স নয়, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির পানি জমে থাকা নানা স্থান এখন এডিসের প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। ফলে চলতি বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ গত বছরের তুলনায় বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে দেশে এখনো হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাম ও হাম-উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের ভিড় বাড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক অভিভাবককে শিশু নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এমন অবস্থার মধ্যেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি নতুন করে চাপ তৈরি করছে স্বাস্থ্য খাতে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির পর রাস্তা, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবন, ফেলে রাখা বোতল, ডাবের খোসা ও ছোট ছোট পাত্রে পানি জমে আছে। এসব স্থানেই দ্রুত বংশবিস্তার করছে এডিস মশা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে মূলত পরিষ্কার পানিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলেও এখন নোংরা ও বদ্ধ পানিতেও এ মশার বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
গুলশানের কড়াইল বস্তি এলাকার বাসিন্দা আকরাম মিয়া জানান, এখন দিনের বেলাতেও মশার কয়েল ছাড়া বসে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, ডেঙ্গুর মশা এখন আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে সারা দেশে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে ডেঙ্গুতে মারা যান ১০৫ জন, যার মধ্যে ৯৫ জনই ছিলেন রাজধানীর বাসিন্দা। ২০২২ সালে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ২৮১ জনে, এর মধ্যে ঢাকায় মারা যান ১৭৩ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়; ওই বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন। এরপর ২০২৪ সালে ৫৭৫ এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে সামনে এডিস মশার বিস্তার আরও বাড়বে। তার মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুর প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে।
যদিও তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ নাও হতে পারে, তবে গত বছরের চেয়ে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও দুই সিটি করপোরেশন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান, লার্ভা ধ্বংস কার্যক্রম, ফগিং, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে ড্রেন ও জলাবদ্ধ স্থান পরিষ্কার, লার্ভিসাইডিং এবং ফগিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি মাইকিং ও সাংস্কৃতিক প্রচারণার মাধ্যমে নাগরিকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রাক্-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। একই সঙ্গে হটস্পট এলাকায় বিশেষ অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, হাম পরিস্থিতির পাশাপাশি ডেঙ্গুকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও পরীক্ষাসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, শুধু ফগিং দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তার মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, অতিরিক্ত জনঘনত্ব ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই ডেঙ্গুর বিস্তারের বড় কারণ। তিনি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬