|
প্রিন্টের সময়কালঃ ২৪ মে ২০২৬ ১২:২১ পূর্বাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ২৩ মে ২০২৬ ০৩:০১ অপরাহ্ণ

চীনের কয়লা খনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত অন্তত ৮২


চীনের কয়লা খনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত অন্তত ৮২


চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের একটি কয়লা খনিতে এক ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ৮২ জন খনি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও অন্তত ৯ জন শ্রমিক মাটির নিচে নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের উদ্ধারে এবং আটকে পড়াদের জীবিত ফিরিয়ে আনতে খনি এলাকায় এক বিশাল উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

 

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, শানসি প্রদেশের 'তংশু গ্রুপ'  দ্বারা পরিচালিত 'লিউশেনইউ কয়লা খনিতে' এই ভয়াবহ বিস্ফোরণটি ঘটে। ঘটনার সময় খনির ভেতর শত শত শ্রমিক কাজ করছিলেন।
 

স্থানীয় সময় গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে (জিএমটি ১১:২৯) খনিটির অভ্যন্তরে আকস্মিক এই গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনার সময় শিফটের দায়িত্ব পালন করছিলেন মোট ২৪৭ জন শ্রমিক। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে খনির একটি বড় অংশ ধসে পড়ে এবং বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ভেতরেই আটকা পড়েন।

 

বিস্ফোরণের পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও খনি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ শুরু হয়। তবে সুড়ঙ্গের গভীরতা এবং বিষাক্ত গ্যাসের কারণে উদ্ধারকারীদের ভেতরে প্রবেশ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং খনির ভেতরে আটকে পড়া সম্ভাব্য বেঁচে থাকা মানুষদের উদ্ধারে কোনো ধরনের খামতি না রাখতে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

 

এক বিবৃতিতে শি জিনপিং বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। উদ্ধার অভিযানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং প্রতিটি নিখোঁজ নাগরিককে খুঁজে বের করতে হবে।

 

এর পাশাপাশি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সাথে অবহেলা বা নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

 

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পর পরই লিউশেনইউ কয়লা খনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তাদের আটক করেছে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

 

নিরাপত্তা বিধিতে কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, কিংবা খনির ভেতর মিথেন গ্যাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে খনি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এটি একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত খনির সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

 

দুর্ঘটনার পর পরই চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় উদ্ধারকাজে গতি আনতে বিশাল কর্মীদল পাঠিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে ৬টি বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলের মোট '৩৪৫ জন দক্ষ উদ্ধারকর্মী, দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।

 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, শত শত উদ্ধারকর্মী, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য এবং প্যারামেডিকস বা জরুরি চিকিৎসকেরা খনির প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়েছেন। অক্সিজেন সিলিন্ডার, ভারী খনন যন্ত্র এবং আধুনিক লাইফ-ডিটেক্টর প্রযুক্তির সাহায্যে সুড়ঙ্গের গভীরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। খনির বিষাক্ত গ্যাস বের করে দেওয়ার জন্য শক্তিশালী ভেন্টিলেশন ফ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে উদ্ধারকর্মীরা নিরাপদে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ ৯ জনের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ততটাই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

 

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে চীন বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা উৎপাদনকারী এবং ব্যবহারকারী দেশ। দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশই আসে এই কয়লা খাত থেকে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে  চীনের কয়লা খনিগুলোকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই সময়ে প্রতি বছর খনি দুর্ঘটনায় হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হতো।

 

তবে গত দুই দশকে এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। চীন সরকার খনি খাতে কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড  কার্যকর করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় গ্যাস ডিটেকশন সিস্টেম এবং অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ছোট ছোট খনিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে এসেছিল। কিন্তু শানসি প্রদেশের এই সাম্প্রতিক বিস্ফোরণটি আবারও প্রমাণ করল যে, শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনও অনেক পথ বাকি এবং খনি শ্রমিকদের জীবন এখনও চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

 

খনি এলাকার বাইরে এখন বিরাজ করছে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা খনির প্রবেশদ্বারের বাইরে ভিড় জমিয়েছেন। স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের বাতাস। নিখোঁজ ৯ জনের পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছেন, যেন তাদের প্রিয়জনদের দ্রুত ফিরিয়ে আনা হয়।
 

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়া মাত্রই নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬