২৯ ব্যাংকে বিশেষ নজরদারি
ব্যাংকিং খাতে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এবার উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর সরাসরি নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ শতাংশের বেশি শ্রেণীকৃত ঋণ রয়েছে—এমন ২৯টি ব্যাংককে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে ঋণ আদায়ে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব ব্যাংকের মধ্যে ২৩টিকে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ছয়টি ব্যাংককে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু হিসাবের খাতায় খেলাপি ঋণের হার কমানো নয়। দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা ঋণ আদায়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ব্যাংকের ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরির প্রবণতা বন্ধ করাও এর লক্ষ্য।
এ জন্য উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় ঋণখেলাপিদের ঋণ আদায়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ব্যাংকভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ অল্পসংখ্যক ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এসব ব্যাংকে শ্রেণীকৃত ঋণের হার বেশি হওয়ায় মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহী ও ঋণ আদায় বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। এসব বৈঠকে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি পদক্ষেপ, ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্থান সুবিধা ব্যবহারের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং নিরীক্ষা, নির্বাহী ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণকে শুধু ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, যেসব ব্যাংকে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ২০ শতাংশের বেশি, তাদের তা ২০ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। আর যেসব ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে, তাদের ১০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
তবে এ ক্ষেত্রে শুধু নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিলের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত অর্থ আদায়ের ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অতীতে পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন কিংবা হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানোর অভিযোগ থাকায় এবার প্রকৃত নগদ আদায় ও ঋণের কার্যকর নিষ্পত্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ প্রস্থান সুবিধাকেও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক অনাদায়ী ঋণ আদায় ও সমন্বয়ে বিশেষ প্রস্থান-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কিন্তু আর্থিক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে এককালীন অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিত পদ্ধতিতে দীর্ঘদিনেও যেসব ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না, নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে ব্যাংকের অর্থ ফেরত আনার সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুবিধা যাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দায়মুক্তির পথ না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে কঠোর যাচাই প্রয়োজন।
শুধু পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায় নয়, ভবিষ্যতে নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতা ঠেকাতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ দেওয়ার সময় যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ। দুর্বল জামানত, অতিমূল্যায়িত সম্পদ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ এবং গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করার মতো কারণে অনেক ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
এ কারণে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা হালনাগাদের কাজও চলছে। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, জামানতের প্রকৃত মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঝুঁকি আরও কার্যকরভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রয়েছে এতে।
দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ সংশোধন এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনাদায়ী সম্পদ দ্রুত ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
ব্যাংকারদের মতে, শুধু মামলা করে বছরের পর বছর অর্থ আটকে রাখলে খেলাপি ঋণের সমস্যার সমাধান হবে না। মামলা, সমঝোতা, সম্পদ বিক্রি, বিশেষ প্রস্থান সুবিধা এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা—এসব ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নীতিমালা বা নির্দেশনার ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা হলো বাস্তবায়নের দুর্বলতা। প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব, আইনি দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যাংকের দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের কারণে খেলাপি ঋণ বারবার বেড়েছে।
তাই ২৯টি ব্যাংকের ওপর বিশেষ নজরদারির উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কর্মপরিকল্পনা কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও তদারক করে তার ওপর। শুধু পুনঃতফসিল বা হিসাব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানো নয়, প্রকৃত অর্থ আদায় এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াকেই সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির (সম্পাদক) | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার (প্রকাশক)
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬