রাজধানী ঢাকার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর। সম্প্রতি মহানগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা এবং ছিনতাই-চাঁদাবাজি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার।
রোববার সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, খাতা-কলমে বড় কোনো ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’র অস্তিত্ব এখন আর রাজপথে নেই; বরং তাদের নাম ব্যবহার করে ফায়দা লোটা অপরাধীদের দমনে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশক বা পরবর্তী সময়ের মতো চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের উপদ্রব বর্তমানে নেই। বর্তমানে যারা অপরাধ করছে, তারা মূলত মাঝারি সারির অপরাধী অথবা পলাতক বা নিষ্ক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে।
তিনি বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের উপদ্রব বর্তমানে নেই। কিছু মাঝারি মানের অপরাধী বা তাদের নাম ভাঙিয়ে কেউ কেউ সন্ত্রাস করার চেষ্টা করে। এরা মূলত নিজেদের মধ্যেই মারামারি বা দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে। সাধারণ জনগণের ওপর সরাসরি আক্রমণের হার অনেক কমে এসেছে।
কমিশনারের এই বিশ্লেষণ এটিই ইঙ্গিত দেয় যে, অপরাধ জগতের পুরোনো কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তবে এই তথাকথিত 'নামধারী' সন্ত্রাসীরা যাতে কোনোভাবেই ডালপালা মেলতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি ও গ্রেফতারি অভিযান চব্বিশ ঘণ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
অপরাধী ধরনে আধুনিকায়ন আসায় পুলিশি তৎপরতাকেও ঢেলে সাজানো হয়েছে। কমিশনার জানান, কেবল থানা পুলিশ নয়, বরং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোও এখন মাঠে সক্রিয়।
রাজধানীর ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি ফেরাতে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) ঘোষণা করেছেন ডিএমপি কমিশনার। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চাঁদাবাজরা অপরাধ করে দেশের যে প্রান্তেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদের টেনে আনা হবে।
চাঁদাবাজদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধ করার পর তারা যদি ঢাকা ছেড়ে দিনাজপুর বা রংপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পালিয়ে যায়, তবে ডিএমপির বিশেষ টিম সেখান থেকেও তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে আসবে। প্রযুক্তির সহায়তায় এবং স্থানীয় পুলিশের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের পালানোর সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা কিছুটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালেও ডিএমপির গত দুই মাসের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। কমিশনার জানান, ছিনতাইকারীদের কোণঠাসা করতে গত ৬০ দিনে অভূতপূর্ব কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার কেবল পুলিশের কাজের বর্ণনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি নগরবাসীর প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হলে নাগরিকদের সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে তথ্য প্রদান অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, কেউ যদি বড় কোনো সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করে হুমকি দেয় বা চাঁদা দাবি করে, তবে ভয় না পেয়ে সাথে সাথে নিকটস্থ থানায় জানান। আপনাদের তথ্যই আমাদের সফলতার চাবিকাঠি।
ডিএমপির বর্তমান সক্রিয়তা এবং কমিশনারের দৃঢ় অবস্থান এটিই প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের জন্য ঢাকা মহানগরী আর নিরাপদ স্বর্গরাজ্য নয়। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ভয় কাটিয়ে সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে, সেটাই বর্তমান ডিএমপি প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের মাধ্যমে ঢাকাকে একটি অপরাধমুক্ত মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে পুলিশ দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।