উৎসবমুখর পরিবেশে বাঙালি বরণ করবে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:৫০ অপরাহ্ণ   |   ৪৯ বার পঠিত
উৎসবমুখর পরিবেশে বাঙালি বরণ করবে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোরের সূর্যের রক্তিম আভা যখন পূর্ব আকাশে নতুন সংকেত দিয়ে উঁকি দিবে, তখন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতাই ওল্টাল না, ওল্টাল একটি জাতির আবেগ আর সংস্কৃতির নতুন পৃষ্ঠা। জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে আগামীকাল বাঙালির দুয়ারে আসবে ‘পহেলা বৈশাখ‘ বাংলা নববর্ষ। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারা বিশ্বের কোটি কোটি বাঙালি মেতে উঠবে প্রাণের উৎসবে।

রাজধানীর রমনার বটমূল থেকে শুরু করে সুদূর মফস্বলের মেঠোপথ, সর্বত্র বেজে উঠবে সেই চিরচেনা সুর: এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। এটি কেবল একটি ঋতু পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার নবায়ন এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের মহোৎসব।

ভোরের আলোয় সুরের মূর্ছনা: রমনার বটমূল

বরাবরের মতো এ বছরও নববর্ষের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু থাকবে রমনা পার্কের বটমূলে। ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মিলিত কন্ঠে ভোরের রাগে নতুন বছরের আবাহন করবে।কয়েক হাজার মানুষ সাদা আর লাল রঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে উঠবে ভোরের স্নিগ্ধতায় ।

ছায়ানটের এবারের প্রতিপাদ্য শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি'।শিল্পী ও আয়োজকদের মতে, বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা কাটিয়ে মানুষের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ফিরিয়ে আনাই নববর্ষের এই সুরের মূল লক্ষ্য হবে । পান্তা-ইলিশের প্রথাগত খাবারের পাশে এবার প্রাধান্য পাবে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নাড়ু, মোয়া এবং দেশি পিঠাপুলির সমাহার।

মঙ্গল শোভাযাত্রা: ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও বাঙালির গর্ব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে আগামীকাল সকাল ৯টায় বের হবে বর্ণাঢ্য ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা‘ ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এই শোভাযাত্রা বৈশ্বিক আবেদন পেয়েছে।

এবারের শোভাযাত্রার থিম এবং মোটিফগুলোতে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটবে। বিশালকায় বাঘ, হাতি, ময়ূর এবং মা ও শিশুর প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছে বাঁশ, কাঠ আর রঙিন কাগজ দিয়ে। এই শোভাযাত্রার মূল বার্তা হলো অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে কল্যাণময় আগামীর পথে যাত্রা করা।

বৈশাখী শোভাযাত্রা আমাদের মেরুদণ্ড। এটি কোনো ধর্মের উৎসব নয়, এটি বাঙালির বেঁচে থাকার উৎসব। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর সর্বজনীনতা। কোনো বিভেদ নেই।

রাজধানীর পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি ছোট-বড় বাজারে পালিত হবে  ‘হালখাতা। লাল মলাটের নতুন খাতায় পুরনো দেনা চুকিয়ে নতুন করে শুরু  হবে বাণিজ্যিক যাত্রা। গ্রাহকদের মিষ্টি ও নিমকি দিয়ে আপ্যায়ন করার দৃশ্যটি থাকবে মুগ্ধকর।

রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সবার শরীরেই দেখা যাবে উৎসবের ছোঁয়া। পোশাকের রঙে বৈচিত্র্য থাকলেও সবার লক্ষ্য  এক: একটু আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

নতুন প্রজন্মের শিশুদের কপালে আঁকা আল্পনা আর হাতে নাগরদোলার বাঁশি প্রমাণ করবে যে, শেকড়ের টান ফুরিয়ে যায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আয়োজিত হবে বৈশাখী মেলার ক্ষুদ্র সংস্করণ।

তৃণমূলের বৈশাখ: গ্রাম বাংলার মেলা

শহুরে কোলাহলের বাইরে গ্রামীণ জনপদে পহেলা বৈশাখ আসে এক ভিন্ন মহিমায়। গ্রামীণ মেলাগুলোয় মাটির তৈরি খেলনা, তৈজসপত্র, বাঁশের বাঁশি, কাঠের কাজ এবং নানা পদের খাবারের পসরা সাজানো হবে । গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা যেমন- বলিখেলা, লাঠিখেলা এবং হা-ডু-ডু প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে বিভিন্ন অঞ্চলে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলা ঘিরে মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা থাকবে তুঙ্গে।

প্রযুক্তির বৈশাখ ও বিশ্বায়ন

২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে পহেলা বৈশাখ কেবল অফলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় বৈশাখী শুভেচ্ছা আদান-প্রদান এবং ভার্চুয়াল আড্ডার মাধ্যমে প্রবাসে থাকা বাঙালিরাও যুক্ত হবেন এই উৎসবে। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন থেকে শুরু করে সিডনি সবখানেই বাঙালির জয়গান প্রতিধ্বনিত হবে।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা

বড় গণজমায়েত নির্বিঘ্ন করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকবে চোখে পড়ার মতো। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং র‍্যাবের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে যা সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে উৎসব পালন করতে পারবেন । সিসিটিভি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা উৎসবস্থলগুলো।

আগামীর প্রত্যাশা

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সাম্য আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। বাংলার মানুষ শপথ নিবেন সংকীর্ণতা আর ধর্মান্ধতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। সূর্যের তেজ যেমন প্রকৃতির ধুলোবালি ধুয়ে দেয়, পহেলা বৈশাখও তেমনি বাঙালির মনের কালিমা মুছে দিয়ে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করবে।

সবশেষে, রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ বাণীতেই বলা যায়, ‘পুরানো যা-কিছু ছিল যাক মুছে যাক, নতুন আসুক নতুনকে দিন ডাক।’

শুভ নববর্ষ ১৪৩৩! বাঙালির এই ঐক্য আর আনন্দ অটুট থাকুক বছরের প্রতিটি দিন।