‘স্থলভাগের সুনামি’তে ধ্বংস নেপাল-তিব্বত সীমান্ত, বেঁচে ফিরেও আতঙ্কে অনেকে

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২৮ আগu ২০২৬ ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ   |   ৩৮ বার পঠিত
‘স্থলভাগের সুনামি’তে ধ্বংস নেপাল-তিব্বত সীমান্ত, বেঁচে ফিরেও আতঙ্কে অনেকে

অনলাইন ডেস্ক:

 

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড় থেকে হঠাৎ নেমে আসা কাদা, বরফ ও পাথরের ভয়াবহ ঢলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি প্রাণে বেঁচে যাওয়া অনেকে। মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় স্বজনহারাদের আহাজারির পাশাপাশি বেঁচে ফেরা মানুষের মধ্যেও বিরাজ করছে আতঙ্ক ও শোক।
 

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল কাদা-পাথরের স্রোত ছিল অনেকটা ‘স্থলভাগের সুনামির’ মতো। আচমকা ধেয়ে আসা সেই স্রোতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও স্থাপনা ভেসে যায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন অনেকে।
 

নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমালও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। বুধবার একটি নবনির্মিত বাড়ির বাইরে টয়লেটের জন্য প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ছিলেন তিনি। হঠাৎ মাটি ও কাদামিশ্রিত পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে আসতে দেখে বাইরে থাকা চার সহকর্মী তাকে দ্রুত বের হয়ে আসতে বলেন।
 

গর্ত থেকে উঠে বিবেক দৌড় শুরু করেন। কিন্তু কিছুদূর যেতেই প্রবল স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত একটি আমগাছে আটকে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। বিবেকের মতো আরও কয়েকজন আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
 

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১৪ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের কাঠমান্ডু ও রাসুয়া এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
 

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া অনেককে একা একা হাঁটতে দেখা গেছে। তাদের চেহারায় আতঙ্ক ও ঘটনার আকস্মিকতার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
 

বেঁচে যাওয়া ৩৫ বছর বয়সী ওমকার জোশি আগের দিন কাছের একটি পাহাড়ে উঠে প্রাণ রক্ষা করেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। পুরো শহর কাদাপানির নিচে তলিয়ে গেছে।’
 

জোশির দাবি, ওই এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তার ভাষায়, জায়গাটি এখন যেন একটি বিশাল কবরস্থান—চারদিকে শুধু রক্তমাখা বালু ও পাথরের টুকরো।
 

তিনি জানান, শত শত মানুষ কাছের পাহাড়ের ঢালে উঠে কোনোভাবে জীবন বাঁচিয়েছেন। রাতভর বৃষ্টির মধ্যে তারা উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় ছিলেন।
 

এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে গিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। সীতা বিকে তাঁর ছোট ভাই রামচন্দ্রকে খুঁজছেন। পেশায় স্কুলশিক্ষক রামচন্দ্রের সঙ্গে ঘটনার দিন সকালে শেষবার কথা হয়েছিল তাঁর। এরপর থেকেই ফোন বন্ধ।
 

সীতা বলেন, ‘অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। কর্মকর্তাদের প্রথম অগ্রাধিকার যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে, তাদের উদ্ধার করা। আমার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
 

একইভাবে ২৪ বছর বয়সী আনিশা নেপালি তাঁর নিখোঁজ মা ও ছোট ভাইয়ের সন্ধানে বুধবার কাঠমান্ডু থেকে দুর্গত এলাকায় ছুটে আসেন। কিন্তু এখনো তাদের কোনো সন্ধান পাননি তিনি। আনিশা বলেন, ‘আমি তাদের নাম দিয়েছি। তবে এখনো কোনো খবর পাইনি।’
 

ত্রিশূলি নদীর তীরে প্রায় দেড়শ বাড়ি ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এর মধ্যে একটি ছাড়া প্রায় সব বাড়িই ধ্বংস হয়ে গেছে। যে ভবনটি টিকে আছে, সেটি চারতলা একটি বৃদ্ধাশ্রম। তবে সেখানেও প্রাণহানি ঘটেছে। কাদামাটির স্রোতে সাতজন বয়োবৃদ্ধ তলিয়ে যান।
 

ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ছবিতে উপড়ে পড়া গাছের নিচে মানুষ চাপা পড়ে থাকার দৃশ্যও দেখা গেছে।
 

তিমুর শহরের বাসিন্দা সাবির মিয়ান জানান, ঢল নামার আগে তারা সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। সেই সতর্কতার কারণে অনেকেই নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন। কিন্তু বাকি সবকিছু ভেসে গেছে। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।’
 

৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল জানান, তিনি এমন ভয়াবহ দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি। তাঁর ভাষায়, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সুনামির মতো সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যত কাছে আসছিল, ততই তার উচ্চতা বাড়ছিল।’
 

ভূমিধসের সময় স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে ছিলেন বড়াল। তিনি বলেন, স্ত্রীকে হাত ধরে ছাদে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রবল কাদার স্রোত তাঁর স্ত্রীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বড়াল কোনোভাবে ছাদে উঠতে পারলেও তাঁর স্ত্রী আর ফিরেননি।
 

অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল বলেন, কাদা ও মাটির এ ধরনের আকস্মিক প্রবাহ অনেকটা স্থলভাগে সুনামির মতো আচরণ করে। দুর্গত এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতাও সেই তুলনাকেই সামনে আনছে।