সারাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাবে হাসপাতালগুলোতে এখন কান্নার রোল। বিশেষ করে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্র দেখলে শিউরে উঠতে হয়। সেখানে শিশুদের বাঁচাতে অনেক মা-বাবা দিন-রাত লড়াই করছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই তীব্র মানবিক সংকটের মধ্যেও শিশুদের সুরক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে একটি মহল এবং খোদ নীতিনির্ধারকেরা উল্টো মায়েদের ওপরই দোষ চাপানোর এক নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে সাড়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত ও সন্দেহজনক সংক্রমণের রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০ হাজার। ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই ১ হাজার ৪৫টি শিশু ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে মারা গেছে ৪৭টি। আক্রান্ত ও মৃত শিশুদের সিংহভাগই এসেছে ঢাকার বাইরে থেকে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে আসল কারণ যেখানে টিকাদানের ব্যর্থতা, পুষ্টিহীনতা এবং স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা, সেখানে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে মায়েদের ‘ফিটনেস সচেতনতা’ এবং বুকের দুধ না খাওয়ানোর মনগড়া তত্ত্ব নিয়ে।
গত ১৩ মে এক সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন, ‘ফিটনেস হারানোর ভয়ে’ দেশের ৫৫ শতাংশ মা তাদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরদিনই অবশ্য তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে নিজের বক্তব্যের কিছুটা সংশোধনী ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
সেখানে তিনি দাবি করেন, ডয়চে ভেলের একটি ‘গবেষণা’ প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে তিনি এই তথ্য দিয়েছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না এবং এর মধ্যে অনেকেরই নানাবিध শারীরিক সমস্যা রয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডয়চে ভেলে বাংলার ওই প্রতিবেদনটি কোনো একাডেমিক গবেষণা ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি সাধারণ সংবাদ প্রতিবেদন। সেখানে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল যে, গবেষণায় দেখা গেছে ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, যার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।
কিন্তু মূল বিষয় হলো, ডা. লেলিন চৌধুরী তার বক্তব্যে কোথাও মায়েদের ‘ফিটনেস নষ্ট হওয়ার ভয়ের’ কথা উল্লেখ করেননি। ইনকিলাব মঞ্চ সম্পূর্ণ মনগড়াভাবে এর সাথে নারীদের শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয়টি জড়িয়ে দেয়, যা প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মায়েদের চরম বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।
ইনকিলাব মঞ্চের এই অযৌক্তিক সুরেরই প্রতিধ্বনি শোনা গেছে খোদ দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের কণ্ঠে। ১৭ মে ‘হাম ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি হামে শিশুমৃত্যু ও পুষ্টিহীনতার জন্য প্রকারান্তরে মায়েদের ঘাড়েই দোষ চাপান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাচ্চাদের পুষ্টির অভাবের পেছনে মায়েদের শারীরিক অক্ষমতা দায়ী। তিনি মায়েদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তাদের শরীরে পুষ্টি নেই, চোখ গর্তে, চামড়া উষ্কখুষ্ক, হাড্ডি দেখা যায় এবং এই মায়েরা বুকের দুধ বা শাল দুধ খাওয়ান না। যদিও মন্ত্রী মায়েদের স্বাস্থ্যগত সংকটের কথা স্বীকার করেছেন, তবুও তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল ভুক্তভোগী মায়েদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
অথচ, রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতালগুলোর বাস্তব চিত্র মন্ত্রীর এই ধারণাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে। হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে দিনাতিপাত করা মায়েদের সিংহভাগই হতদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের।
গাজীপুর থেকে আসা ২৪ বছর বয়সী এক শীর্ণকায় মা, যিনি হিজাব দিয়ে শরীর ঢেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছেলের পাশে বসে আছেন, তিনি জানান যে তার স্বামী চাননি বলে তার চার সন্তানের কাউকেই কোনো টিকা দেওয়া হয়নি। এখানে মায়ের ফিটনেস সচেতনতার কোনো প্রশ্নই আসে না, বরং এটি মূলত পারিবারিক সিদ্ধান্তহীনতা, শিক্ষার অভাব এবং সচেতনতার সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
তাছাড়া, বর্তমানে বাজারে শিশুখাদ্য বা গুঁড়া দুধের যে আকাশচুম্বী দাম, তাতে হাসপাতালে আসা এই মায়েদের তা কিনে খাওয়ানোর আর্থিক সামর্থ্যই নেই। বাধ্য হয়েই তারা বুকের দুধ খাওয়ান, কিন্তু তাদের নিজেদের শরীরেই তীব্র পুষ্টিহীনতা থাকায় অনেক সময় পর্যাপ্ত দুধ আসে না।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার আগের তুলনায় কমছে ঠিকই, তবে তার পেছনে মায়েদের ফিটনেস-ভাবনার কোনো প্রমাণ মেলেনি। ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে শূন্য থেকে পাঁচ মাস বয়সী শিশুদের শুধু মায়ের বুকের দুধ (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং) খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া, বাড়িতে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৭১ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪০ শতাংশ হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমার আসল কারণগুলো হলো: নির্দিষ্ট বয়সের আগেই শিশুদের পানি বা পরিপূরক খাবার দেওয়া, বোতলে নিপল লাগিয়ে দুধ খাওয়ানোর ক্ষতিকর প্রবণতা, সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের উচ্চ হার (যার কারণে জন্মের প্রথম ঘণ্টায় দুধ দেওয়া সম্ভব হয় না)।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশীদ জাহান তার দীর্ঘ ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, ফিটনেসের বিষয়টি বড় জোর উচ্চবিত্ত ৫ শতাংশ মায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, তবে সাধারণ মায়েদের ক্ষেত্রে এটি অবাস্তব। তিনি বলেন, নতুন মায়েরা অনেক সময় সন্তানকে সঠিকভাবে দুধ খাওয়ানোর নিয়ম জানেন না। জন্মের প্রথম দুই-তিন দিন বুকে দুধ কম আসলে তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো মানসিক বা শারীরিক সহযোগিতা পান না।
এছাড়া কর্মজীবী মায়েদের সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকাও একটি বড় কারণ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আইনি ফাঁক গলে গুঁড়া দুধের কোম্পানির লোভনীয় বিজ্ঞাপন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের ২০২২ সালের একটি বৈশ্বিক যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে ৯৮ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী তাদের সন্তানকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর তীব্র ইচ্ছা পোষণ করেন, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় অনেক বেশি। সুতরাং, মায়েরা ইচ্ছা করে ফিটনেস ধরে রাখতে দুধ খাওয়াচ্ছেন না এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ মায়েদের বুকের দুধ না খাওয়ানো নয়, বরং গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঢাকা কার্যালয় এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বাংলাদেশে শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের ক্ষেত্রে একটি বিশাল ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও, দেশের একটা বড় অংশের শিশু এই সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন যে, তারা একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন এবং আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি ও মহামারির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য প্রশাসন সেই সতর্কবার্তাকে সময়মতো আমলে নেয়নি।
আইভিএফ পদ্ধতিতে দীর্ঘ ১১ বছর পর সন্তান পেয়েছিলেন ফারজানা ইসলাম ও হেলাল ভূঁইয়া দম্পতি। তাদের ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী একমাত্র সন্তান ফাইয়াজ হাসান তাজিম গত ২২ এপ্রিল হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ১৭ দিন হাসপাতালে রেখে চার লাখেরও বেশি টাকা খরচ করেও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফারজানার আবেগঘন পোস্ট পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়: নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাচ্ছে, এ নিয়ে সংসদে আলাপ নেই। কারও কোনো দায় নেই। কেউ ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। সব দোষ মা ও শিশুর। শিশুরা এই দেশে জন্ম নিল কেন? মা সন্তানের জন্ম দিল কেন?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফের ২০২৫ সালের প্রাক-প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৩ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী তীব্র রক্তস্বল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভুগছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী একজন গর্ভবতী নারীর অন্তত ৪ বার প্রসবপূর্ব সেবা (অ্যান্টিনেটাল কেয়ার) নেওয়া উচিত হলেও, মাত্র ৪৩.৩ শতাংশ মা তা পান। আর ৮ বার সেবা পান মাত্র ৫.৫ শতাংশ নারী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি বিশিষ্ট চিকিৎসক ফওজিয়া মোসলেম এই পুরো বিষয়টিকে নারীদের ওপর এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক আক্রমণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, হামে সন্তান মারা যাওয়ার জন্য মায়েদের দায়ী করা মূলত আসল ঘটনাকে আড়াল করার একটি সস্তা কৌশল।
আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বাল্যবিবাহের শিকার একজন প্রান্তিক মায়ের নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই থাকে না। তার নিজের শরীরেই যেখানে হাড় জিরজিরে পুষ্টিহীনতা, সেখানে তিনি সন্তানকে পর্যাপ্ত দুধ কীভাবে দেবেন? তাদের আর্থিক অবস্থাই বা কেমন, তা বিবেচনা না করে ঢালাওভাবে মায়েদের দোষ দেওয়া অত্যন্ত অনভিপ্রেত।
হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে সাড়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য নীতির জন্য একটি বড় চড়। হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) অভাব, চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে অভিভাবকদের দেউলিয়া হওয়া এবং সময়মতো টিকার জোগান না থাকা এগুলোই বর্তমান সংকটের মূল উৎস।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও নীতিগত অবহেলাকে আড়াল করতে অবৈজ্ঞানিক ও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে মায়েদের ‘ফিটনেস ভাবনা’কে দায়ী করা কেবল অন্যায়ই নয়, বরং তা ভুক্তভোগী মায়েদের মাতৃত্বের প্রতি চরম অবমাননা। রাষ্ট্রকে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে অনতিবিলম্বে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে টিকাদানের ঘাটতি পূরণ করতে হবে, অন্যথায় এই লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।