মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে চলছে অস্থিরতা। বিশ্ববাজারে ৪০ শতাংশ দাম বেড়েছে জ্বালানি তেলের। ফলে দেশের বাজারেও দাম বাড়বে বলে আলোচনা শুরু হয়। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কারণ সরকার থেকে বারবার বলা হচ্ছে, সরবরাহ ও পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু কালোবাজারি ও অবৈধ মজুতের কারণে তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই দাম না বাড়িয়ে সংকট কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও দাম না বাড়ানোয় এক মাসেই পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
এদিকে দেশেও দাম বাড়বে– এমন ধারণায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের মজুত শুরু করে। এ অবস্থায় প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার লিটার মজুত তেল জব্দ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মজুতের কারণে চলমান জ্বালানি তেলের সংকট আরও ঘনীভূত হয়। সরবরাহ বাড়লেও মানুষের ভোগান্তি কমেনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে চালকদের। কৃষি সেচ, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দেয়।
গতকাল মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে বলা হয়, এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকবে। অর্থাৎ ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম মার্চের মতো ১০০ টাকা থাকবে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা, পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ আর অকটেনের দাম ১২০ টাকা অপরিবর্তিত থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসেও এ দামে বিক্রি হয়েছে জ্বালানি তেল। এর আ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত সোমবার সংসদে বলেন, এক মাসে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৯৮ শতাংশ। প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে এখন খরচ হচ্ছে ১৯৮ টাকা। ১২০ টাকায় অকটেন বিক্রি করলেও সরকারের খরচ হচ্ছে ১৫০ টাকা ৭২ পয়সা।
৮৭ হাজার ৭০০ লিটার তেল জব্দ
দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার অবৈধভাবে মজুত জ্বালানি জব্দ করেছে জেলা প্রশাসন। একই সময়ে ৩৯১টি অভিযান চালিয়ে ১৯১টি মামলায় মোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরায় একজনকে দুই মাস, চাঁদপুরে একজনকে এক বছর এবং গাজীপুরে একজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, জব্দ জ্বালানির মধ্যে রয়েছে ডিজেল ৬৭ হাজার ৪০০ লিটার, অকটেন ছয় হাজার ৪৪৪ লিটার এবং পেট্রোল ১৩ হাজার ৮৫৬ লিটার।
সরকারি তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ডিজেল এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন সাত হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন মজুত রয়েছে। এতে জ্বালানি সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করেছে সরকার।
রাতে পেট্রোল-অকটেন বিক্রি বন্ধের দাবি
দেশজুড়ে জ্বালানি পরিস্থিতির অস্থিরতার মধ্যে পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে রাতের বেলায় পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ছোট যানবাহনের এই জ্বালানি বিক্রির জন্য সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ডিজেল সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার কথা জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, রাতে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে– পাম্পে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; বাস্তবতার ভিত্তিতে তেল সরবরাহ বাড়ানো; গ্রাহকদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান; ট্যাঙ্ক শূন্য হওয়ার আগেই হুড়োহুড়ি না করা; পেট্রোল-অকটেন বিক্রির সময়সীমা নির্ধারণ; ট্যাঙ্ক লরিতে পূর্ণ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তেল সরবরাহ এবং মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
দেশজুড়ে অভিযান
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাহিদা ও মজুতদারি বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় পৃথক দুই অভিযানে ৭ হাজার ৪০০ লিটার অবৈধ ডিজেল জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় দুই ব্যবসায়ীকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার পর উপজেলার বারইপাড়া ফেরিঘাট ও কলাবাড়িয়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে।
কিশোরগঞ্জে জ্বালানি তেলের জন্য প্রতিটি পাম্পের সামনে যানবাহন ভিড় করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই বেশি। নোয়াখালীর চাটখিল পৌর শহরে আনিতাশ ও তারাজ ফিলিং স্টেশনে অকটেন সংকট। খোলা বাজারে অকটেন বিক্রি হচ্ছে। বৈধ কাগজপত্রসহ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া জ্বালানি প্রদানে রংপুরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার একটি মুদির দোকান থেকে ৮০০ লিটার পেট্রোল জব্দ করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের কাসেম এন্টারপ্রাইজকে অবৈধভাবে ২০০ লিটার ডিজেল তেল মজুত করায় আট হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় জ্বালানি তেলের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’ সংগ্রহ করতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বখতিয়ার রহমান (৫৫) নামে এক ব্যবসায়ী মারা গেছেন।
(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা)