রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ শিশুও রয়েছে। এ হামলায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। একই সঙ্গে দেশটির আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলাটিকে রাশিয়ার অন্যতম ‘ঘৃণ্য হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে। সেখানে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন ধসে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকালে ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ জানায়, ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারের পর শহরটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচ শিশু রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, সেখানে আহত হয়েছেন প্রায় ৫৫ জন।
রাজধানী কিয়েভেও হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। একটি আবাসিক ভবনে হামলার পর আরও দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হলে শহরটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়ায়। শহরের উপকণ্ঠে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আরও দুজন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাতভর ইউক্রেনজুড়ে প্রায় ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো ছিল উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। পাশাপাশি কয়েক ডজন শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। দেশজুড়ে হামলায় প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্মদিনের দিনেই এই হামলা চালানো হয়। রাতে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ‘পুতিন নিজেকে এমন একটি জন্মদিনের উপহার দিয়েছেন—শিশু ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু।’ তিনি আরও বলেন, হামলাটি ছিল ইউক্রেনের বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে রাশিয়ার শক্তি প্রদর্শনের একটি চেষ্টা।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, কিয়েভের পাশাপাশি মধ্যাঞ্চলের ওলেক্সান্দ্রিয়া ও ক্রেমেনচুকসহ বিভিন্ন এলাকাতেও বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। হামলায় আবাসিক এলাকা ছাড়াও শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া ৪৬টি জেটচালিত ড্রোন ছুড়েছে। এর ৮০ শতাংশের কিছু বেশি ধ্বংস বা ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর তুলনায় এবার ড্রোন প্রতিহতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
প্রিলুকিতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালায় জরুরি সেবা বিভাগ। উদ্ধারকর্মীরা খননযন্ত্র ও বেলচা দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পাশাপাশি মই ব্যবহার করে ভবনের ওপরের তলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। শহরের উপমেয়র দানিলো সাভেনকো জানিয়েছেন, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য হামলাটিকে ইউক্রেনের সামরিক-শিল্প স্থাপনা লক্ষ্য করে পরিচালিত ‘ব্যাপক হামলা’ হিসেবে দাবি করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, কিয়েভসহ চেরনিহিভ, কিরোভোহরাদ, দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, পোলতাভা ও খারকিভ অঞ্চলের সামরিক স্থাপনায় স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য উচ্চনির্ভুলতার অস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
মস্কোর দাবি, হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ফায়ার পয়েন্ট’-এর বিভিন্ন স্থাপনা। প্রতিষ্ঠানটি ফ্লামিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন তৈরি ও সংরক্ষণ করে বলে দাবি করেছে রাশিয়া।
এদিকে ইউক্রেন জানিয়েছে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও প্রয়োজন। জেলেনস্কি বলেন, বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষায় তাঁর সরকার এ ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার ভেতরে কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনা ও একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে দেশটির বাহিনী। জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকলে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও পাল্টা হামলা চালানো হবে।
হামলার আশঙ্কায় বুধবার রাতেই ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছিল। কিয়েভের অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তার জন্য ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেন। রাতভর রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
অন্যদিকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন খেরসন ও দোনেৎস্ক অঞ্চলেও ইউক্রেনীয় হামলায় হতাহতের খবর দিয়েছে রুশপন্থি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, খেরসনে ড্রোন হামলায় দুই বেসামরিক ব্যক্তি এবং দোনেৎস্কে আরও তিনজন নিহত হয়েছেন।