আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসান কমাতে দেশের বাজারে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা লিটার হয়েছে। নতুন এ দাম দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে জ্বালানি আমদানিতে যেখানে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা, চলতি বছরের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়। একইভাবে গত বছরের মে মাসে ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকার আমদানি ব্যয় চলতি বছরের মে মাসে বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। আগস্টে আমদানি ব্যয় ২ হাজার ৭৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিপিসির নিজস্ব তহবিলে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু এপ্রিলে লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরেও বিপিসির লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দেয় বিপিসি। চিঠিতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত লোকসানের অর্থ সরকারি সহায়তা হিসেবে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক-কর কমানো বা প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি।
বিপিসির অর্থসংকট নিয়ে গত সপ্তাহে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে জ্বালানি আমদানির জন্য বিপিসির হাতে মাত্র ১৫ দিনের অর্থ রয়েছে বলে জানানো হয়। সংকট মোকাবিলায় বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো ওই অর্থ ছাড় হয়নি।
বিপিসি জানিয়েছে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে চলতি বছর ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে সংস্থাটির রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ আগামী দুই মাসের জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। শুধু ডিজেল বিক্রিতেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
এ অবস্থায় লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।