জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ বা Right of Usufruct সংক্রান্ত বিধান ইসলামী হেবা আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম ও আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ (কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)-এর সভাপতি আল্লামা মুফতি একরাম হোসাইন অদুদী।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইসলামী শরিয়তে হেবা বা দানের ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি গ্রহীতার শরিয়তসম্মত কবজ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাতা হেবা করার পরও নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করলে হেবার মৌলিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
মুফতি একরাম হোসাইন অদুদী বলেন, ইসলামী শরিয়তে মানুষের সম্পদ ও মালিকানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর বৈধ সম্পদ ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহার এবং শরিয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। তবে হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য শুধু দলিল বা আইনি আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়; শরিয়ত নির্ধারিত শর্তও পূরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি দান করার পরও নিজের জীবদ্দশায় সেটি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। নির্দিষ্ট শর্তে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এ ধরনের দান কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে দাতা সম্পত্তি দান করার পরও এর ভোগদখলের অধিকার নিজের কাছে রাখলে হেবার প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
হানাফি ফিকহের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, হেবা কার্যকর হওয়ার জন্য হেবাকৃত সম্পত্তির কবজ গ্রহণ অপরিহার্য। শুধু মৌখিকভাবে হেবা করা কিংবা কাগজে-কলমে মালিকানা হস্তান্তর করলেই তা পূর্ণতা পায় না। সম্পত্তির ওপর গ্রহীতার কর্তৃত্ব ও কবজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি।
বিবৃতিতে তিনি হযরত আবু বকর (রা.) ও তাঁর কন্যা হযরত আয়েশা (রা.)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর ‘আল-আলিয়া’ নামের সম্পত্তির ২০ ওয়াসাক খেজুরের ফলন হযরত আয়েশা (রা.)-কে হেবা করেছিলেন। তবে তিনি তা কবজ করেননি। পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর আগে হযরত আবু বকর (রা.) বলেন, আয়েশা (রা.) যদি সম্পত্তিটি কবজ করতেন, তাহলে তা তাঁর হতো; অন্যথায় তা উত্তরাধিকারীদের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে এবং আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে।
মুফতি একরাম হোসাইন অদুদী বলেন, এ ঘটনা থেকে হেবা সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে কবজের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ইবনু হাজার আসকালানি (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, হেবার মালিকানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কবজের বিষয়টি ইসলামী ফিকহে গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রীয় আইনে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনগতভাবে কার্যকর হতে পারে। তবে একজন মুসলমানের জন্য শরিয়তের বিধানও বিবেচ্য। রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন হেবা-সংক্রান্ত শরিয়তের মৌলিক শর্তের বিকল্প হতে পারে না।
দাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় সম্পত্তি হেবা করার দাবি করলেও শরিয়তসম্মতভাবে গ্রহীতার কবজ প্রতিষ্ঠিত না হলে দাতার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তি তাঁর মালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। এরপর তা শরিয়তের নির্ধারিত নিয়মে যোগ্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক মুসলমান। তাঁদের পারিবারিক সম্পদ, উত্তরাধিকার এবং দান-হেবা সংক্রান্ত বিষয় ইসলামী বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান ও পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিবৃতির উপসংহারে মুফতি একরাম হোসাইন অদুদী বলেন, ‘ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ ব্যবস্থা ইসলামী হেবা-নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিধানটি পুনর্বিবেচনা করে প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
একই সঙ্গে আলেম-ওলামা, আইনজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন নাগরিকদের তথ্য ও দলিলের ভিত্তিতে বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি ও শরিয়তের বিধানের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।