চাহিদার প্রায় পুরো ডিজেল ও অকটেন দেশেই উৎপাদন হয়। ১০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ ডিজেলের মজুত রয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে গতকাল দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। এর পরও জ্বালানি তেল নিয়ে টানাটানি কমছে না। সন্ধ্যার পরও পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
এই খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) রেশনিং করায় পাম্প মালিকরা চাহিদা অনুসারে তেল পাচ্ছেন না। এদিকে আতঙ্কে লোকজন বেশি করে তেল কিনতে ভিড় করছেন। সব মিলিয়ে এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি তেল বেচাকেনায় চলছে নৈরাজ্য। তেলের রেশনিং ঈদযাত্রার ভোগান্তি আরও বাড়াবে বলে শঙ্কা যাত্রী কল্যাণ সমিতির। সংকট কাটাতে পেট্রোল পাম্প মালিকরা অন্তত অকটেন ও পেট্রোলে রেশনিং তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করছিল। ডিপো থেকে রেকর্ড তেল বিক্রি হয়েছে। কেউ যেন বেশি কিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে কারণে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই রেশনিং তুলে দেওয়া হতে পারে।
জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পে ভিড় করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, মানুষের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। তবে সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মার্চে কোনো সরবরাহজনিত সংকট নেই। এপ্রিল ও মে মাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি চলছে। বিকল্প উৎস হিসেবে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানির বিষয়েও কাজ চলছে। বাংলাদেশে তেলের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের।
রেশনিং ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বাড়াবে
পরিবহনে জ্বালানি তেল সরবরাহে সিলিং বা রেশনিং পদ্ধতি চালু থাকলে আসন্ন ঈদযাত্রায় ভোগান্তি বাড়বে এবং ভাড়ায় নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদে ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাবে। পাশাপাশি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় তিন থেকে চার কোটি মানুষের যাতায়াত হতে পারে। তিনি জানান, এ সময় বিভিন্ন শ্রেণির লঞ্চে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ, অটোরিকশায় ৩০ লাখ, হিউম্যান হলারে ৮০ লাখ, দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে ৩০ লাখ এবং সিটি বাসে ৪০ লাখ ট্রিপ হতে পারে। এ ছাড়া রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ ট্রিপের সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করা হলে ট্রিপ কমে যাওয়া, যাত্রী ভোগান্তি বৃদ্ধি এবং ভাড়া নৈরাজ্যের ঝুঁকি তৈরি হবে বলে দাবি করেন তিনি। তাই ঈদের দিন পর্যন্ত পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাম্পে দীর্ঘ সারি
ঢাকাসহ সারাদেশের পাম্পে ক্রেতার দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং আঞ্চলিক শহরগুলোতে পাম্পে পৌঁছানোর পরও তেল না পাওয়ায় অনেক ক্রেতা হতাশ। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। পাম্পের কর্মীরা জানিয়েছেন, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না আসায় পাম্পগুলোতে তেল বিক্রি করা যাচ্ছে না।
পেট্রোল-অকটেন সরবরাহ উন্মুক্ত করার দাবি
চলমান পরিস্থিতিতে পেট্রোল ও অকটেনের ডিপো পর্যায়ে সরবরাহ দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাদের মতে, সরবরাহ উন্মুক্ত করা হলে পাম্পে ভিড় এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমবে। মঙ্গলবার সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে এ দাবি জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন ডিপোতে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহে প্রায় ২৫ শতাংশ রেশনিং করা হচ্ছে। এতে অনেক পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পৌঁছাচ্ছে না। সংগঠনটির দাবি, এ দুই জ্বালানির বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হওয়ায় সরবরাহ উন্মুক্ত করা হলে বর্তমান সমস্যার প্রায় ৮০ শতাংশ সমাধান সম্ভব।
রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫ লিটার জ্বালানি
জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও বাজারে আতঙ্ক কমাতে রাইড শেয়ারিং সেবায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার অকটেন বা পেট্রোল সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছে বিপিসি। মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, মহানগর এলাকায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে এবং তেল নেওয়ার সময় রসিদ সংরক্ষণ ও অ্যাপের মাধ্যমে চালকের তথ্য যাচাই করতে হবে।
সিলেটে ধর্মঘট প্রত্যাহার
সিলেটে পাম্পগুলোর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও ডিপো থেকে জ্বালানি তেল উত্তোলন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মালিকরা। মালিক সমিতির সভাপতি রিয়াশদ আজিম বলেন, বিপিসির রেশনিং ও দৈনিক ক্রয়সীমা নির্ধারণের নীতিমালা ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পাম্পগুলোতে যে পরিমাণ তেল রয়েছে, তা বিক্রি শেষ হলে ডিপো থেকে আর তেল নেওয়া হবে না। তিনি জানান, সিলেট বিভাগে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ লাখ লিটার ডিজেল, প্রায় দুই লাখ লিটার পেট্রোল এবং দেড় লাখ লিটার অকটেনের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাম্পে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে প্রায় এক লাখ লিটার। এতে পরিবহন ব্যয়ও ওঠে না বলে দাবি করেন তিনি।
বকেয়া পাওনা নিয়ে বৈঠক সিদ্ধান্তহীন
ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বকেয়া পাওনা জমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। পাওনা নিয়ে বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) গতকাল মঙ্গলবার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে বৈঠক করেন। সূত্র জানায়, বিপ্পার পক্ষ থেকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পাওনা টাকা পরিশোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। সংগঠনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত এ বিষয়ে বলেন, আমাদের আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরেছি। কারণ ব্যাংকে আমাদের কাছে অনেক টাকা পাওনা রয়েছে। আবারও জ্বালানি তেল আমদানি করতে হলে অন্তত ৬০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা জরুরি। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জোরালো আশ্বাস মেলেনি।
ডিজেল সরবরাহ কমায় আমদানি-রপ্তানিতে চাপের শঙ্কা
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রামে ডিজেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় সাগরে চলাচলরত লাইটার জাহাজের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এতে গভীর সমুদ্র থেকে বন্দরে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় এক হাজার ৫০টি লাইটার জাহাজ নদীপথে পণ্য পরিবহন কাজে নিয়োজিত। জ্বালানি সংকটে অনেক জাহাজ কর্ণফুলী নদীতে পণ্য নিয়ে ভাসছে এবং গন্তব্যে যেতে পারছে না।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের আহ্বায়ক সফিক আহমেদ জানান, বিষয়টি জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহনের বরাদ্দ পায়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে একটি জাহাজের প্রায় তিন হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক জাহাজ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ গন্তব্যে যেতে পারছে না।
সংকট দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতেও। এসব ডিপোর কার্যক্রম সচল রাখতে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল লিমিটেড চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না দেওয়ায় রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে।
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।