গতিশীল রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ এক্সেস নয়, দরকার বাস্তবসম্মত নীতি

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ৩০ আগu ২০২৫ ০৮:৪১ অপরাহ্ণ   |   ৪৯ বার পঠিত
গতিশীল রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ এক্সেস নয়, দরকার বাস্তবসম্মত নীতি

আমান উল্লাহ সরকার:-
 

​​​​



 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক প্রস্তাব করদাতাদের মধ্যে এক নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আলোচিত বিষয়টি হলো—করদাতাদের ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ এক্সেস নেওয়া। রাজস্ব বৃদ্ধি রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য; কারণ এটি সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনকল্যাণমূলক খাত পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য কি সত্যিই নাগরিকদের প্রতিটি ব্যাংক লেনদেনের ওপর নজরদারি করা জরুরি? নাকি বিকল্প কোনো আধুনিক, সীমিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব?

 

পূর্ণাঙ্গ এক্সেসের প্রস্তাব: কেন বিতর্কিত?

করদাতার ব্যাংক হিসাবের সম্পূর্ণ এক্সেস দাবি করা হলে তা সরাসরি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চায় তার আর্থিক তথ্য সুরক্ষিত থাকুক। প্রতিটি আয়-ব্যয়ের খুঁটিনাটি সরকারি তদারকির আওতায় চলে গেলে করদাতাদের আস্থায় চিড় ধরবে। অনেকেই হয়তো বিকল্প উপায়ে, এমনকি ব্যাংকের বাইরে নগদ লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে পারেন। এর ফলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ার পরিবর্তে কমার ঝুঁকি তৈরি হবে।

 

শুধু তাই নয়, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ব্যাংক গ্রাহকরা যখন বুঝবেন যে তাদের প্রতিটি লেনদেন নজরদারিতে রয়েছে, তখন তারা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক আর্থিক প্রবাহে যুক্ত হতে পারেন। এতে একদিকে ব্যাংকিং খাত সংকুচিত হবে, অন্যদিকে আর্থিক স্বচ্ছতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 

বিকল্প সমাধান: সীমিত কিন্তু কার্যকর নীতি
বাংলাদেশে রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য করজাল সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এটি হতে হবে এমনভাবে, যাতে আস্থা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বজায় থাকে। এর জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও প্রযুক্তিনির্ভর নীতি হতে পারে—

ই-রিটার্ন সিস্টেমে মাত্র দুটি তথ্য অটো-সিনক্রোনাইজ করা

প্রতিটি ব্যাংক বছরের শেষে এনবিআরের ই-রিটার্ন সিস্টেমে কেবল দুটি তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে হালনাগাদ করবে—

1. সংশ্লিষ্ট হিসাবের বার্ষিক মোট লেনদেনের পরিমাণ

2. ৩০ জুন পর্যন্ত ক্লোজিং ব্যালেন্স

এতেই কর প্রশাসন করদাতার আর্থিক সক্ষমতার একটি সার্বিক ধারণা পাবে। এই তথ্য করদাতার আয়কর রিটার্নে প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা সহজ হবে। যদি কারও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে ব্যাংক তথ্যের অস্বাভাবিক অমিল থাকে, তবে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে আলাদাভাবে অডিট করা যেতে পারে।

 

এই ব্যবস্থার মূল সুফল

করদাতার আস্থা বজায় থাকবে

প্রতিটি লেনদেন খুঁটিনাটি নজরদারিতে না গিয়ে শুধু সারসংক্ষেপ তথ্য ব্যবহৃত হলে নাগরিকেরা মনে করবেন না যে তাদের গোপনীয়তা ভঙ্গ হচ্ছে।

 

রাজস্ব আদায় বাড়বে

টিআইএন ছাড়া বড় লেনদেন সম্ভব না হলে এবং ব্যাংক তথ্য অটো-সিনক্রোনাইজ হলে কর ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সবাইকে কর নেটওয়ার্কে আসতে হবে।

 

সহজ ও লক্ষ্যভিত্তিক অডিটিং সম্ভব হবে

প্রত্যেকের জন্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য না নিয়ে কেবল সন্দেহভাজন বা ঝুঁকিপূর্ণ করদাতার ক্ষেত্রেই বিস্তারিত অনুসন্ধান করা যাবে। এতে অডিটিং আরও কার্যকর ও দক্ষ হবে।

 

ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাতে পারবেন। কারণ তারা জানবেন, তাদের খরচের খুঁটিনাটি নয়, শুধু সারসংক্ষেপ তথ্যই সরকারের কাছে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

বিশ্বের বহু দেশে কর প্রশাসন ব্যাংক তথ্য ব্যবহারে “risk-based auditing” পদ্ধতি অনুসরণ করে। সেখানে সবাইকে নজরদারিতে রাখা হয় না। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে কেবল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা সন্দেহজনক লেনদেনকারীকে টার্গেট করা হয়। বাংলাদেশেও একই মডেল গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমবে এবং করদাতার আস্থা বাড়বে।

 

করজাল সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। তবে ব্যাংক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ এক্সেস দাবি করা একটি অকার্যকর ও বিতর্কিত পদক্ষেপ। এটি করদাতার মনে ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি করবে, যা রাজস্ব বৃদ্ধির পরিবর্তে রাজস্ব হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করবে।

 

বরং সীমিত ও কার্যকর ব্যবস্থা—যেমন টিআইএন ছাড়া বড় লেনদেন নিষিদ্ধ করা এবং ই-রিটার্ন সিস্টেমে বার্ষিক মোট লেনদেন ও ৩০ জুন পর্যন্ত ক্লোজিং ব্যালেন্স অটো-সিনক্রোনাইজ করা—হলে কর প্রশাসনও প্রয়োজনীয় তথ্য পাবে, আবার নাগরিকের আস্থাও অটুট থাকবে।

 

সবশেষে বলা যায়—রাজস্ব বাড়াতে নাগরিকের গোপনীয়তা বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং আস্থা, প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। আর এর সাথে ক্যাশলেস লেনদেনের বিস্তার যুক্ত হলে কর সংগ্রহ আরও সহজ, কার্যকর এবং টেকসই হবে—যা হবে ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন অগ্রযাত্রার ভিত্তি।