আবদুল হাকিম রানা, দক্ষিণ চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মানোন্নয়ন ও সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সেবাগ্রহীতারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ বাড়লেও প্রয়োজনীয় শয্যা, অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা সে অনুযায়ী না বাড়ায় দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র সহযোগিতায় এবং সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), পটিয়ার উদ্যোগে এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়েবের সভাপতিত্বে সভা সঞ্চালনা করেন সনাক পটিয়ার সহ-সভাপতি ও সাংবাদিক আবদুর রাজ্জাক।
সভায় বক্তব্য দেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সাজ্জাদ ওসমান, সাবেক সনাক সভাপতি, লেখক ও সাংবাদিক এস. এম. এ. কে. জাহাঙ্গীর, সনাক সহ-সভাপতি শীলা দাশ, সেবাগ্রহীতা ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুর রশীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক, সাংবাদিক আবদুল হাকিম রানা, সিনিয়র স্টাফ নার্স পুলকিত দত্ত এবং এসিজি-স্বাস্থ্য সমন্বয়ক মীর আরিফুল ইসলাম।
এ ছাড়া সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে মো. ইদ্রিচ, আনিসুর রহমান, শাহনাজ বেগম, সায়েরা বেগম, রুম্পা নাথ, হাফেজ আহমদ, ইয়াছমিন আকতার ও শিরু আকতারসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
গণশুনানির শুরুতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে বক্তব্য দেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সাজ্জাদ ওসমান। তিনি বলেন, বর্তমানে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিনই রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকে। সীমিত জনবল দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে অন্তর্বিভাগে প্রতিদিন ১০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ প্রায় সব ধরনের ল্যাব পরীক্ষা চালু রয়েছে। তবে রোগীর চাপ সামাল দিতে অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেবাগ্রহীতাদের সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গণশুনানিতে সেবাগ্রহীতারা জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার পরিধি বাড়ায় রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অন্তর্বিভাগে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। দুই থেকে তিন দিন পর কোনো শয্যা খালি হলে তখন তা পাওয়া যায়। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান তারা।
এ ছাড়া নিচতলায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নিতে হয়। এ কারণে হাসপাতালের বারান্দায় ফ্যানের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তারা। পাশাপাশি হাসপাতালের বাথরুম নিয়মিত পরিষ্কার রাখার এবং দ্বিতীয় তলায় নারী রোগীদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা করার দাবি ওঠে।
সেবাগ্রহীতারা আরও বলেন, লোডশেডিংয়ের সময় বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা ও বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যাহত হয়। এমনকি বিদ্যুৎ না থাকায় চোখের চিকিৎসাও নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন একজন সেবাগ্রহীতা। হাসপাতালের জন্য সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।
তবে বক্তারা হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিকতার প্রশংসা করেন এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সেবাদানের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানান।
সভাপতির বক্তব্যে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়েব বলেন, গত দেড় বছরে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেশ কিছু উন্নয়ন হয়েছে। এর মধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু, অচল এক্স-রে মেশিন সচল এবং ল্যাবে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াসহ প্রায় সব ধরনের পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও চালু রয়েছে।
তিনি জানান, নতুন ভবনের তৃতীয় তলার সম্প্রসারণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এটি চালু হলে রোগীদের মেঝেতে অবস্থান করে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। বর্তমানে ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন।
ডা. আবু তৈয়েব আরও বলেন, কেলিশহরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমবিবিএস চিকিৎসক পদায়ন করা হয়েছে। ধলঘাটে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন হয়েছে। পাচুরিয়া ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নতুন ভবনের অনুমোদনও শিগগিরই হতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ থেকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি ঘোষণা আসতে পারে।
গণশুনানিতে উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ডা. আবু তৈয়েব বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মানোন্নয়নে সেবাগ্রহীতারা যেকোনো সময় সরাসরি অভিযোগ ও পরামর্শ দিতে পারেন। চিকিৎসক-নার্সদের আন্তরিকতা এবং সেবাগ্রহীতাদের সহযোগিতায় হাসপাতালের সেবার মান আরও উন্নত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।