আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর এবং বোরো মৌসুমের কৃষি কাজের কথা বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের স্বস্তির ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি তেলের রেশনিং পদ্ধতি আজ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হচ্ছে।
একই সাথে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি লাঘব এবং কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সারা দেশে রেশনিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি বিশেষ বিষয়কে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বর্তমান সময়ে সারা দেশে বোরো ধানের আবাদ চলছে। কৃষকদের সেচ পাম্প পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। রেশনিং ব্যবস্থার কারণে কৃষকদের মধ্যে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিরসনেই সরকার এই কঠোর ব্যবস্থা তুলে নিয়েছে।
সামনেই ঈদুল ফিতর। প্রতি বছর ঈদের সময় লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ত্যাগ করেন। পরিবহন খাতে তেলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রেশনিং চালু থাকলে গণপরিবহনে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের ঈদ আনন্দ যাতে ম্লান না হয়, সেজন্যই আজ থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হবে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে জ্বালানির জোগান বাড়াতে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বেশ কয়েকটি জাহাজ পাইপলাইনে রয়েছে এবং তেল নিয়ে বন্দরে পৌঁছানোর অপেক্ষায় আছে। এর ফলে বাজারে জ্বালানির কোনো ঘাটতি থাকবে না।’
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রাশিয়ার তেলের বিকল্প উৎস। প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, রাশান ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) অন্য কোনো তৃতীয় দেশ থেকে রিফাইন্ড বা পরিশোধিত হয়ে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া একটি রুশ কোম্পানি সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা এমন এক ধরনের ক্রুড অয়েল সরবরাহ করতে সক্ষম যা বাংলাদেশের বর্তমান রিফাইনারিগুলোতেই সরাসরি পরিশোধন করা যাবে। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেশনিং তুলে নেওয়ার সুযোগে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী বা ফিলিং স্টেশন মালিক যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘সরকার চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ নিশ্চিত করছে। কেউ যদি অধিক মুনাফার আশায় তেল মজুত করে বা সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকবে।’
তিনি দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান যেন সবাই দায়িত্বশীল আচরণ করেন। অপচয় রোধ করলে এবং সবাই নিয়ম মেনে চললে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
সচিবালয়ের ব্রিফিং অনুযায়ী, আজ ১৫ মার্চ থেকে সকল বিতরণ পয়েন্ট এবং ডিপো থেকে ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল খালাস শুরু হয়েছে। পরবর্তী কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকবে। গত কয়েক দিনের রেশনিংয়ের ফলে যে চাপের সৃষ্টি হয়েছিল, তা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় স্বস্তি হিসেবে এসেছে। বিশেষ করে তেলের দাম না বাড়ার প্রতিশ্রুতি পরিবহন ভাড়া স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে। কৃষি, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সচল রাখতে সরকারের এই সময়োচিত সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।