মাদারগঞ্জে ৯ বছর ধরে বন্ধ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঠদান ছাড়াই বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগ

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:৪৭ অপরাহ্ণ   |   ৬৩ বার পঠিত
মাদারগঞ্জে ৯ বছর ধরে বন্ধ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঠদান ছাড়াই বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগ

মো. আলমগীর হোসাইন হৃদয়, জামালপুর প্রতিনিধি:

 

 

 

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় নয় বছর ধরে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও শিক্ষকরা সরকারি বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৪ নম্বর বালিজুড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম সুখনগরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এ অভিযোগ সামনে এসেছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ২০১৭ সাল থেকে বিদ্যালয়টিতে কার্যত নিয়মিত পাঠদান বন্ধ রয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময় বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন বই বিতরণের সময় কয়েকদিন বিদ্যালয় খোলা হয়। বই বিতরণ শেষ হলে আবার বিদ্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাদের আরও অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় পাশের একটি কিন্ডারগার্টেন থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী এনে উপস্থিত দেখানো হয়।

 

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নথি অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মোট ৬২ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ১২ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১০ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ১০ জন, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে কতজন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে কিংবা কতজন উপবৃত্তি পাচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গত ২৫, ২৭, ২৮ ও ৩০ জুন টানা চার কার্যদিবসে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষে তালা ঝুলছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়নি এবং প্রতিষ্ঠানের কোনো সাইনবোর্ডও চোখে পড়েনি। চার দিনেই একই চিত্র দেখা যায়। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কিংবা আশপাশে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও দেখা যায়নি।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের আশপাশে কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থী কমে গেছে। এছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর বিদ্যালয়টি প্রয়োজনীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়নি। পাকা ভবন না থাকায় নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে।”

 

বিদ্যালয়টির দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমার কাছে থাকা প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত চলছে বলে উল্লেখ রয়েছে। আমি গত সাত মাস ধরে মাদারগঞ্জে কর্মরত থাকলেও এ বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয় এখনো সরেজমিনে পরিদর্শন করিনি। প্রধান শিক্ষকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়টি চালু রয়েছে বলে জানি।”

 

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। বিদ্যালয়টি সম্পর্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত এটিও বিস্তারিত বলতে পারবেন। তবে আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বিদ্যালয়টিতে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে একাধিক কার্যদিবসে বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ পাওয়া গেল কেন? সরকারি নথিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে তারা কোথায় পাঠ গ্রহণ করছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

 

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টির সার্বিক কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।