মো: আমিনুল ইসলাম, কলামিস্ট:
অশীতিপর বিশ্বপ্রকৃতির কোলে ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ অভিধা নিয়ে মানুষের আগমন ঘটেছিল সত্য, কিন্তু কখনো কখনো সেই মানুষের অন্তরাত্মায় যে হিংস্রতার চাষ হয়, তা পশুর স্বভাবজাত রূঢ়তাকেও স্নান করে দেয়। এক অরণ্যচারী বন্যপ্রাণী কেবল তখনই নখ-দন্ত উদঘাটন করে, যখন তার জঠরজ্বালা জাগ্রত হয় কিংবা প্রাণের স্পন্দন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ? মানুষ বোধকরি নিখিল বিশ্বের একমাত্র ব্যতিক্রমী সত্তা, যে কোনো অভাব বা সংকট ছাড়াই—কেবলমাত্র নিজের ক্ষুদ্র অহমিকা ও অন্ধ স্বার্থের মোহে অন্ধ হয়ে অন্য এক জীবনের দীপশিখা এক নিমেষে নিভিয়ে দিতে পারে।
স্বার্থের এই অন্ধকূপে মানুষ কত সহজে বিসর্জন দেয় তার অর্জিত নীতি-নৈতিকতা। অকৃত্রিম বন্ধুত্বকে নিমেষে রূপ দেয় চরম শত্রুতায়, বিশ্বাসের শুভ্র চাদরে হেনে দেয় অতর্কিত বিষাক্ত ছোবল। ভালোবাসার পবিত্র নিবেদনে সাজায় নিপুণ অভিনয়ের মঞ্চ, আর ক্ষমতার মোহাচ্ছন্ন লোভে পরম আত্মজনকেও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না।
আজকের এই আধুনিক ধরাধানীর পানে দৃষ্টিপাত করলে এক তীব্র বিষাদে হৃদয় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে—
প্রকৃতির আর্তনাদ: নিজ ভোগবিলাসের বলি চড়াতে মানুষ ধ্বংস করে চলেছে চিরহরিৎ প্রকৃতির প্রাণবন্ত ভারসাম্য।
রক্তাক্ত মানবতা: অন্ধ স্বার্থের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধের নিষ্ঠুর দাবানলে ছাই করে দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ নিরীহ প্রাণ।
সরলতার বিনাশ: মানুষের অকৃত্রিম সরলতাকে দুর্বলতা ভেবে বুনে চলেছে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার সুসূক্ষ্ম জাল।
বনের পশুর কোনো ছদ্মবেশ থাকে না; তাই হিংস্র হলেও বাঘ কিংবা সিংহকে চিনে নেওয়া ক্ষতিকর নয়। কিন্তু আধুনিক মানুষের মুখচ্ছবি আবৃত থাকে মেকি হাসির অজস্র বিভ্রান্তিকর মুখোশে। এদের সম্মুখভাগের রূপ এক, আর নেপথ্যের অবয়ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বাসের এই চরম অযোগ্যতাই মানুষকে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে নিখুঁত অথচ শংকাজনক এক "শিকারী" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে ইতিহাস ও প্রকৃতি সাক্ষী—অন্যের সর্বনাশের ওপর নির্মিত বিজয়ের সৌধ সাময়িক, চিরন্তন নয়। অমোঘ প্রকৃতি তার স্বকীয় নিয়মে নিয়তির বিচার সম্পন্ন করে। তাই সময় এসেছে ভেতরের এই বিষাক্ত ছদ্মবেশীকে বিসর্জন দেওয়ার। আসুন, আমরা স্বার্থান্ধতার শিকল ছিঁড়ে পরম ভালোবাসা ও অগাধ বিশ্বাসের ভিড়ে পুনর্জন্ম দিই সেই খাঁটি 'মানুষ' সত্তার।