চারঘাটে কমিউনিটি ক্লিনিক: কাগজে স্বাস্থ্যসেবা, বাস্তবে তালা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২৭ আগu ২০২৬ ০৬:০৭ অপরাহ্ণ   |   ১০০ বার পঠিত
চারঘাটে কমিউনিটি ক্লিনিক: কাগজে স্বাস্থ্যসেবা, বাস্তবে তালা

মো. শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো:

 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় রয়েছে ২৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক। সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, রোগের স্ক্রিনিং, প্রয়োজনীয় পরামর্শ, রোগী রেফার এবং বিনামূল্যে ২৭ ধরনের জরুরি ওষুধ দেওয়ার কথা এসব ক্লিনিক থেকে। তবে বাস্তবে এর অনেকগুলোতেই মিলছে না নির্ধারিত স্বাস্থ্যসেবা।
 

সরেজমিনে গত দুই শনিবার ও সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে চারঘাট উপজেলার ঝিকরা, খোর্দগোবিন্দপুর, বনকিশোর, মুংলি, বাসুদেবপুর ও ভায়ালক্ষীপুর কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ে একটিও খোলা পাওয়া যায়নি। কোথাও রোগীরা ক্লিনিকের সামনে অপেক্ষা করছেন, আবার কোথাও বন্ধ ক্লিনিকের সামনে গরু-ছাগল বাঁধা অবস্থায় দেখা গেছে।
 

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি ক্লিনিক খোলা থাকার কথা। একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নিয়মিত সেবা দেওয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ) ও পরিবার কল্যাণ সহকারীর (এফডব্লিউএ) সেবা দেওয়ার কথা। ফলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে রোগীদের সেবা পাওয়ার কথা।
 

কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক ক্লিনিক নিয়ম মেনে খোলা হয় না। কোনো দিন বেলা ১১টার দিকে খুললেও অল্প সময়ের মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো দিন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা মেলে না।
 

ঝিকরা ও ভায়ালক্ষীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে পরপর দুই শনিবার এবং গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। ক্লিনিকের সামনে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা খোদেজা বেগম ও ভায়ালক্ষীপুর ইউনিয়নের মেহেদী।
 

তারা বলেন, “শনিবার কখন ক্লিনিক খোলে, তার ঠিক নেই। অন্যদিনও সময়মতো স্বাস্থ্যকর্মীরা আসেন না। দুই-তিন দিন ঘুরে কখনো খোলা পাওয়া যায়। আজও আধা ঘণ্টা ধরে বসে আছি, ক্লিনিক খুলবে কি না জানি না।”
 

তবে ঝিকরা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি আকতার বানু দাবি করেন, ১৫ আগস্ট শনিবার অসুস্থ থাকায় তিনি ক্লিনিকে যেতে পারেননি। মঙ্গলবার অফিসের মিটিং এবং ২১ আগস্ট শনিবার অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় ক্লিনিক বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, “ইচ্ছে করে ক্লিনিক বন্ধ রাখিনি।”
 

খোর্দগোবিন্দপুর কমিউনিটি ক্লিনিকেও পরপর দুই শনিবার গিয়ে খোলা পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সপ্তাহের অন্য দিনও নির্ধারিত সময়ে ক্লিনিক খোলা থাকে না।
 

স্থানীয় বাসিন্দা মখসেদুল ইসলাম (৬২) বলেন, “এই ক্লিনিক কখন খোলা থাকে আর কখন বন্ধ থাকে, কেউ বলতে পারে না। সরকারের নিয়ম এখানে চলে না। নিরাশ হয়ে রোগীরাও আসা বন্ধ করে দিচ্ছে।”
 

খোর্দগোবিন্দপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জাকিয়া নাসরিন বলেন, তিনি অফিস থেকে ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন। এ কারণে ক্লিনিক বন্ধ ছিল। স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনিও অফিসের কাজে গেলে ক্লিনিক খোলা রাখা সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।
 

এদিকে মুংলি কমিউনিটি ক্লিনিকে সপ্তাহের চার দিন গিয়ে এক দিনও খোলা পাওয়া যায়নি। কোনো দিন সেখানে বয়স্ক রোগীদের ক্লিনিকের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে, আবার কোনো দিন ক্লিনিকের সামনে গরু-ছাগল বাঁধা ছিল।
 

চিকিৎসা নিতে আসা মমেনা বেগম, মকবুল হোসেন ও রশিদা খাতুন বলেন, “কয়েক দিন ধরে ঘুরছি। ক্লিনিক খোলা পাচ্ছি না। উপজেলা হাসপাতাল এখান থেকে অনেক দূরে। কষ্ট হলেও প্রতিদিন এখানে অপেক্ষা করছি। কিন্তু ক্লিনিক খোলা পাচ্ছি না।”
 

মুংলি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মনিরা খাতুন বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। তিনি জানান, তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ছুটির দিন ছাড়া ওই ব্যক্তির প্রতিদিন ক্লিনিক খোলার কথা। ছুটিতে যাওয়ার আগে তিনি কখনো ক্লিনিক বন্ধ রাখেননি বলেও দাবি করেন।
 

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সাধারণ রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং জটিল রোগীদের উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাও দেওয়ার কথা এসব ক্লিনিক থেকে।
 

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী বছরে তিন থেকে চার দফায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। মাঝখানে কর্মীদের বেতন ও ওষুধ সরবরাহে কিছুটা সমস্যা থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
 

ওমেনস এনগেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম (ওয়েভ)-এর চারঘাট উপজেলা সমন্বয়কারী আঞ্জুমান আরা বলেন, প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনায় অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু তদারকির অভাব ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের হাতের নাগালে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া। ক্লিনিকের দরজায় তালা থাকলে সেই উদ্যোগের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
 

এ বিষয়ে চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক রেজা বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়মিত খোলা থাকে না—এমন অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষ যেন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সঠিক সেবা পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।”